তিন দশক পরও অমলিন তারকা সালমান শাহর জনপ্রিয়তা

তিন দশক পরও অমলিন তারকা সালমান শাহর জনপ্রিয়তা
তিন দশক পরও অমলিন তারকা সালমান শাহর জনপ্রিয়তা
ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও তার জনপ্রিয়তা আজও অমলিন। তার স্বল্প সময়ের কর্মজীবন এবং রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে মানুষের আগ্রহ এখনো বিদ্যমান।

ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় এবং আলোচিত নায়কদের একজন সালমান শাহ। রূপালি পর্দায় তার আগমন ছিল যেন ধূমকেতুর মতো। স্বল্প সময়ের কর্মজীবনেই তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা বাংলা চলচ্চিত্রে আজও একটি বিরল উদাহরণ। তার মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও দর্শকের হৃদয়ে এই নায়ক এখনো অমলিন।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সে সালমান শাহ মৃত্যুবরণ করেন। তার আকস্মিক মৃত্যু তখন পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গন এবং অসংখ্য ভক্তকে স্তব্ধ করে দেয়। মৃত্যুর পর থেকেই ঘটনাটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সালমান শাহর মৃত্যুরহস্য নিয়ে মানুষের আগ্রহ এখনো শেষ হয়নি।

সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে তার মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং হত্যাকাণ্ড হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষ করে তার মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে এখনো সোচ্চার রয়েছেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছে।

মাত্র সাড়ে তিন বছরেরও কম সময়ের চলচ্চিত্র কর্মজীবনেই সালমান শাহ তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তার অভিনয়, পোশাক, চুলের স্টাইল, কথা বলার ধরন ও ব্যক্তিত্ব—সবকিছুই নব্বইয়ের দশকের তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। তার সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করা নায়িকাদের সিনেমাগুলোও দর্শকের বিপুল সাড়া পেয়েছিল।

সালমান শাহ শুধু একজন সফল নায়ক ছিলেন না; তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রের তারকাখ্যাতির সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিলেন। তার জনপ্রিয়তা সিনেমার পর্দা ছাড়িয়ে বাস্তব জীবনেও বিস্তৃত ছিল। মৃত্যুর পরও তার সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি এক নস্টালজিক তারকা হয়ে উঠেছেন।

তার মৃত্যুর তিন দশক পরও ঢালিউডে সালমান শাহর মতো তারকা-উন্মাদনা তৈরি করতে পেরেছেন এমন উদাহরণ খুব কম। তার অভিনীত সিনেমা, গান ও চরিত্র এখনো দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত। প্রতি বছর ৬ সেপ্টেম্বর এলেই ভক্তদের মাঝে প্রিয় নায়কের স্মৃতি ফিরে আসে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার ছবি, সিনেমার দৃশ্য ও গান। নানা আয়োজনেও তাকে স্মরণ করা হয়। তার স্মৃতিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনের উন্মুক্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং সপ্তাহব্যাপী বিশেষ ম্যাটিনি শো আয়োজন করা হয়।

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা জামান ইষ্টি জানান, তার বাবা-মা দুজনেই সালমান শাহর ভক্ত। তাদের কাছ থেকেই তিনি সালমান শাহ সম্পর্কে জানতে পারেন এবং তার স্বল্প সময়ের সাফল্য ও রহস্যজনক মৃত্যু তাকে আগ্রহী করে তোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিছা নূজহাত বলেন, সালমান শাহকে তার ব্যতিক্রমী এবং আইকনিক ব্যক্তিত্বের জন্য ভালো লাগে। তিনি অভিনয় বা ফ্যাশন সেন্স—সবক্ষেত্রেই অন্যদের চেয়ে দু'কদম এগিয়ে ছিলেন।

১৯৯৩ সালে 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' সিনেমায় অভিনয় করে সালমান শাহ রাতারাতি তারকা বনে যান। চলচ্চিত্রটির শেষ দৃশ্যের মতোই চার বছর পর তার জীবনের রথ হঠাৎ থেমে যায়। চলচ্চিত্র সমালোচকরা জানান, মৃত্যুর ৩০ বছর পরও সালমান শাহকে ঘিরে এই আলোচনা ও কৌতূহল খুবই বিরল।

চলচ্চিত্র গবেষক, নির্মাতা ও অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন রাজু বলেন, সালমান শাহর যেমন একটি ক্রেজি ফ্যানডম তৈরি হয়েছে, তা অন্য নায়কদের ক্ষেত্রে হয়নি। তার ফ্যাশন, অভ্যাস-বদভ্যাস—এগুলো দর্শকরা এখনো ধারণ করে তাকে অনুসরণ করছে, যা দেশের বাস্তবতায় বিরল। দর্শক, পরিচালক এবং চলচ্চিত্র সমালোচকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার সাবলীল অভিনয়, চালচলন এবং পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে তরুণদের মধ্যে এখনো এক ধরনের আগ্রহ রয়েছে। এর বাইরে মৃত্যু রহস্য ঘিরেও তাকে নিয়ে অনেকের মধ্যে বাড়তি কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

সিলেটের হযরত শাহজালালের দরগাহ সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। সেখানে এখনো অনেক ভক্তকে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। একজন ভক্ত জানান, সালমান শাহর কবর দেখার জন্য তিনি প্রায় সাড়ে তিনশ' কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন।

সিলেটের হযরত শাহজালালের দরগাহ সংলগ্ন কবরস্থান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে দাড়িয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত সালমান শাহ ভবন, যা মূলত তার নানাবাড়ি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই বাড়িতেই সালমান শাহর জন্ম হয়েছিল। আদর করে বাবা-মা তার নাম রাখেন চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার, ডাকনাম ছিল ইমন।

তার বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। ইমনের জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই তার পোস্টিং হয় কুমিল্লায়। পরে সেখানকার একটি স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু হয় ইমনের। স্কুলে ভর্তির সময় তার লম্বা নাম নিয়ে দেখা দেয় বিপত্তি। শিক্ষকরা জানান, ভর্তি করতে হলে নাম ছোট করতে হবে।

সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী জানান, তখন স্কুলে 'সালমান' বাদ দিয়ে চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার রাখা হয়েছিল। শিক্ষকদের পরামর্শে ইমনের পরিবার যখন তার নাম থেকে 'সালমান' শব্দটি বাদ দিচ্ছিল, তখন তারা কল্পনাও করতে পারেননি যে, বড় হওয়ার পর তাদের ছেলে ঢাকাই চলচ্চিত্রে নাম লেখাবেন এবং স্কুলে ফেলে দেওয়া নামেই সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠবেন। 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' মুক্তির আগে সিনেমাটির পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তার 'সালমান' নামটি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখেন।

তবে ভক্তদের ভালোবাসার পাশাপাশি সালমান শাহর মৃত্যু ঘিরে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তরও এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। মা নীলা চৌধুরীর দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সত্য উদঘাটনের প্রত্যাশাও তাই বারবার আলোচনায় আসে। সময়ের স্রোতে অনেক তারকা এসেছেন, অনেকে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু সালমান শাহ যেন ব্যতিক্রম। মাত্র ২৪ বছরের জীবনে এবং স্বল্প সময়ের কর্মজীবনে যে উজ্জ্বল ছাপ তিনি রেখে গেছেন, তিন দশক পরও তা মুছে যায়নি। ঢালিউডের আকাশে তার তারকা-দ্যুতি এখনো আগের মতোই উজ্জ্বল।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...