ট্রাইব্যুনালে টিপু হাওলাদারের স্ত্রীর জবানবন্দি: ক্রসফায়ারের ভয়ে বাড়ি ছেড়েও শেষ রক্ষা হয়নি

ট্রাইব্যুনালে টিপু হাওলাদারের স্ত্রীর জবানবন্দি: ক্রসফায়ারের ভয়ে বাড়ি ছেড়েও শেষ রক্ষা হয়নি
ট্রাইব্যুনালে টিপু হাওলাদারের স্ত্রীর জবানবন্দি: ক্রসফায়ারের ভয়ে বাড়ি ছেড়েও শেষ রক্ষা হয়নি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে টিপু হাওলাদারের স্ত্রী জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি জানান, ক্রসফায়ারের ভয়ে তাঁর স্বামী বাড়ি ছাড়েন, পরে ডিবি পুলিশ তাঁকে তুলে নিয়ে যায় এবং ক্রসফায়ারে নিহত হন।

গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২–এ টিপু হাওলাদারের স্ত্রী সুমা আক্তার জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর স্বামী ক্রসফায়ারের ভয়ে বরিশালের আগৈলঝাড়ার বাড়ি ছাড়েন। দুই দিন পরই ডিবি পুলিশ তাঁকে রাজধানীর কেরানীগঞ্জ থেকে তুলে নিয়ে যায়।

এর এক দিন পর টেলিভিশনের খবরে সুমা আক্তার জানতে পারেন, তাঁর স্বামীকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি ২০তম সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দি দেন।

২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা ক্রসফায়ারের শিকার হন। জবানবন্দিতে সুমা আক্তার উল্লেখ করেন, তাঁর স্বামী একটি এনজিও পরিচালনার পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা–কর্মীর সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল।

এ কারণে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা–কর্মীরা টিপুকে তাঁদের দলে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দিতেন। এই পরিস্থিতিতে টিপু সব সময় বিষণ্ন থাকতেন। সুমা আক্তার জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে বলেছিলেন, তৎকালীন সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ তাঁকে একটি সভায় দেখা করতে বলেছেন।

তাঁর স্বামী প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। সুমা আক্তার আরও বলেন, এক রাতে তাঁর স্বামী তাঁকে বলেছিলেন, ‘বরিশালে দুই–তিনটা ক্রসফায়ার হয়ে গেছে। আমার কিছু হয়ে গেলে তোমার এবং আমার সন্তানদের কী হবে?’ টিপু হাওলাদার স্নাতকোত্তর পাস ছিলেন।

তখন স্ত্রী সুমা তাঁকে পরামর্শ দেন সাময়িকভাবে ঢাকায় গিয়ে চাকরির চেষ্টা করতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এলাকায় ফিরে আসতেও তিনি স্বামীকে বলেছিলেন। ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি টিপু হাওলাদার ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।

তিনি কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে তাঁর মামার বাসায় যান। সুমা আক্তার বলেন, ২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে তাঁর মামি ও আরেক আত্মীয় তাঁকে ফোন করে জানান, ডিবি পুলিশ এসে তাঁর স্বামীকে তুলে নিয়ে গেছে।

ভোরে সুমা তাঁর শাশুড়ি ও ভাশুরকে নিয়ে আগৈলঝাড়া থানায় যান। পুলিশ টিপুকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে কিছু জানে না বলে জানায়। এরপর তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান মর্তুজা খান, আওয়ামী লীগ নেতা সালেহ মোহাম্মদ লিটন, রইস সেরনিয়াবাতসহ স্থানীয় নেতাদের কাছে যান।

তাঁরা সুমাকে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে বরিশালে তাঁর বাসভবনে গেলেও দারোয়ান সুমা আক্তারকে ভেতরে ঢুকতে দেননি। সুমা আক্তার বলেন, ২০ ফেব্রুয়ারি সারাদিন তিনি স্বামীর কোনো খোঁজ পাননি।

পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি টেলিভিশনের খবরে দেখতে পান, তাঁর স্বামী টিপু ও কবির মোল্লা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। কিছুদিন পরে তিনি লোকমুখে জানতে পারেন, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এহসান উল্লাহর নির্দেশে উজিরপুর থানার মাহাবুল ও জসিম এই ক্রসফায়ার দিয়েছেন। এ মামলার চার আসামির মধ্যে উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও তৎকালীন এসপি এ কে এম এহসান উল্লাহ পলাতক রয়েছেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...