জাতীয়

তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে তীব্র বিরোধ: কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ

তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে তীব্র বিরোধ: কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ
তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে তীব্র বিরোধ: কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ
জাতিসংঘে প্রকাশ্য বাগ্‌যুদ্ধ এবং আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমশ অবনতি হচ্ছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এনেছে। এই অধিবেশনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তার ভাষণে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নাম উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকেন। তুর্কি বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল এক সুচিন্তিত কূটনৈতিক কৌশল, যা ইসরায়েলি নেতার যেকোনো বৈধতা বা কূটনৈতিক অবস্থান মুছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়।

এরদোয়ান তার বক্তব্যে গাজা, ফিলিস্তিনি জনগণ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার ওপর জোর দেন। তিনি ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু সরাসরি ও ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এরদোয়ানকে একজন ‘স্বৈরাচারী’ আখ্যা দেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, তুরস্ক নাকি ‘ইহুদিবিদ্বেষী মিথ্যা ছড়ানোর সবচেয়ে নতুন কেন্দ্রে’ পরিণত হয়েছে।

নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, আঙ্কারা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংস্থা হামাসের নেতৃত্বকে আশ্রয় দিচ্ছে। নেতানিয়াহু ভাষণ শুরু করতেই ডজন ডজন প্রতিনিধি অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। এটি কেবল ফিলিস্তিনেই নয়, বরং পুরো অঞ্চলে ইসরায়েলি সরকারের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। এরদোয়ান ইস্তাম্বুলে এক অনুষ্ঠানে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের’ জায়গা জাতিসংঘের মঞ্চ নয়; তাদের স্থান হলো আদালতের কাঠগড়ায়।

আঙ্কারা ও তেল আবিব এখন প্রায় প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় বিরোধপূর্ণ ইস্যুতে এক অলঙ্ঘনীয় বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। তুর্কি-ইসরায়েল সম্পর্কের অবনতি এখন আর কেবল কূটনৈতিক বাগ্‌যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে তুরস্কের বিচার বিভাগ নেতানিয়াহুসহ আরেক ইসরায়েলি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির জন্য ইন্টারপোলের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানায়।

গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে যাওয়া ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র ওপর আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলের সশস্ত্র আক্রমণের ঘটনায় ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই ইস্তাম্বুলের একটি আদালত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। তুরস্ক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক পদক্ষেপও নিয়েছে, যার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করা এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়া অন্তর্ভুক্ত।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, ইসরায়েলের কর্মকর্তারা তুরস্কের প্রতি তাদের শত্রুতা ও উসকানিমূলক অবস্থান আর গোপন করছেন না। দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ প্রকাশ করেন যে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি ঠেকাত ‘প্রকাশ্যে ও নেপথ্যে’ কাজ করছে ইসরায়েল। স্মোটরিচ দাবি করেন, ‘এরদোয়ান অত্যন্ত বিপজ্জনক একজন মানুষ’ এবং ‘বর্তমান অবস্থায় তুরস্ক ইসরায়েলের জন্য এক মস্ত বড় হুমকি।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত নেতানিয়াহু এ সপ্তাহে একটি সরকারি আইনি দলকে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে মামলা প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই মামলায় কুর্দিদের প্রতি তুরস্কের নীতি এবং হামাসকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ আনা হবে বলে জানানো হয়। এই ফাটল আঞ্চলিক অঙ্গনগুলোতে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান, যেখানে তুরস্কের শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সরাসরি ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদ ও আগ্রাসনের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে।

গাজায় এক আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনে অবদান রাখতে তুরস্ক বারবার নিজেদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান নিশ্চিত করেছেন যে এমন কোনো আন্তর্জাতিক মিশনের অংশ হিসেবে আঙ্কারা সেনা পাঠাতে প্রস্তুত। কিন্তু ইসরায়েল সরাসরি তুরস্কের যেকোনো ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করেছে। নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গাজার আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে তুর্কি বা কাতারি সৈন্যদের উপস্থিতি ইসরায়েল মেনে নেবে না। সিরিয়ার ক্ষেত্রেও এই চিত্র ঠিক একই রকম। সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তন ও স্থিতিশীলতার পেছনে তুরস্ক বিপুল বিনিয়োগ করেছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...