জাতীয়আপিল বিভাগে আইনজীবীর মন্তব্যে প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ
আপিল বিভাগে আইনজীবীর মন্তব্যে প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ
গতকাল মঙ্গলবার আপিল বিভাগে সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের আদালত অবমাননাকর মন্তব্যের জেরে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন। এক আইনজীবীকে জরিমানা করাকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন। তথ্য গোপন ও প্রতারণার অভিযোগে এক আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করাকে কেন্দ্র করে শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের আদালত অবমাননাকর বক্তব্য প্রদানের পর এই ঘটনা ঘটে।
আপিল বিভাগে ঠিক কী ঘটেছিল, প্রধান বিচারপতি কেন এজলাস ত্যাগ করলেন, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে বিস্তারিত তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি জানান, ২০১৩ সালে একটি কাজী নিয়োগ থেকে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়, যেখানে মামলার বাদী একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে পাঁচটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রুলস অনুযায়ী, পূর্বে দায়েরকৃত কোনো মামলা যদি প্রত্যাখ্যাত হয়, তবে পরবর্তী মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে পূর্বের মামলার বিষয়বস্তু সম্পর্কে উল্লেখ করতে হয় এবং নতুন কজ অব অ্যাকশন তৈরি করতে হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, ওই নারী আইনজীবী পাঁচটি রিট পিটিশন ফাইল করলেও পূর্বের প্রত্যাখ্যাত রায়ের আদেশ পরবর্তী পিটিশনে উল্লেখ করেননি। এই কারণে আপিল বিভাগ ওই নারী আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা এবং মামলার রিট পিটিশনারকেও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার এই অর্থ সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই মামলাগুলো ওই একই নারী আইনজীবী নিম্ন আদালতে ফাইল করেছিলেন, যার সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, গতকাল সকালে ৯টা-সোয়া ৯টার দিকে যখন এই আদেশটি হয়, তখন মাহবুব উদ্দিন খোকন উপস্থিত ছিলেন না। ওই নারী আইনজীবী তার পাশে বসে আদেশটি শোনেন এবং বারবার বলছিলেন, ‘খোকন ভাই আমাকে কী বিপদে ফেলল! আমাকে কী বিপদে ফেলল!’
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ঘটনার সূত্রপাত হয় দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটের সময়। মাহবুব উদ্দিন খোকন যখন বলেন, ‘একজন আইনজীবীকে আপনারা ফাইন করেছেন এবং ফাইন করার পরিপ্রেক্ষিতে...’, তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দেখেন, আমরা সবকিছু দেখে-শুনে একটা আদেশ দিয়েছি, আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না।’ তিনি যোগ করেন, আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী সিরিয়াস ফ্রড কমিট করা হয়েছে এবং আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে, এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতোপূর্বের আদেশও ফ্রড করা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস জানান, এরপর মাহবুব উদ্দিন খোকন অপ্রত্যাশিতভাবে বলে ফেলেন, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’ প্রধান বিচারপতি বিষয়টি প্রথমে হালকাভাবে নেন এবং জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি কি এটা মিন করেন?’ মাহবুব উদ্দিন খোকন যখন একই কথা বলার চেষ্টা করেন, তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি যে কথাটা বলেছেন, সেটা অ্যাবসোলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল।’
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ‘যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’ এই কথা বলে তিনি এজলাস থেকে উঠে যান। ব্যারিস্টার কাজল মনে করেন, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি হচ্ছেন আইনজীবীদের অভিভাবক। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগে আইনজীবীরা যা-ই বলুন না কেন, তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, কখনো কখনো প্রধান বিচারপতি আদালতে আইনজীবীদের বকা দেন, তবে তারা সেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান না। এখানকার সৌন্দর্য হলো, এটি ওই মামলা বা ওই ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, এর বাইরে কিছু হয় না। রাষ্ট্রের প্রতি, সমাজের প্রতি এবং জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এই প্রত্যাশা বজায় থাকবে।
পরে এ বিষয়ে ব্যারিস্টার খোকন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, একজন আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তিনি প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে বিনয়ের সঙ্গে বলেন যে, প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আসলে মামলা শুনানি আগের মতো করা যাচ্ছে না। এ কারণে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।
ব্যারিস্টার খোকন আরও বলেন, একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়াটা অনেক বেশি হয়ে গেছে, তাই তাকে মাফ করতে তিনি অনুরোধ করেন। তখন প্রধান বিচারপতি জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমি চিফ জাস্টিস হওয়ার পর কি লইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে?’ ব্যারিস্টার খোকন তখন বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, আগে ১১ জন বিচারপতির তিনটি বেঞ্চ ছিল, যেখানে তারা মামলা শুনানি করতেন। এখন একটি বেঞ্চ এবং একটি মামলা চলছে।
মতামত (0)