জাতীয়

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন নীতিতে তেলের প্রাধান্য: মাদুরো অপসারণ ও নতুন চুক্তি

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন নীতিতে তেলের প্রাধান্য: মাদুরো অপসারণ ও নতুন চুক্তি
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন নীতিতে তেলের প্রাধান্য: মাদুরো অপসারণ ও নতুন চুক্তি
মার্কিন সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ওয়াশিংটন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কথা বলেছিল। তবে সম্প্রতি ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের তেল চুক্তির ঘোষণা এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন নীতিতে তেলের প্রাধান্য দেখাচ্ছে।

গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও আটক করা হয়। সেই সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে। তিনি আরও জানান, দেশটি একটি ‘নিরাপদ ও সুষ্ঠু’ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে যাবে।

আট মাসেরও বেশি সময় পর ওয়াশিংটনের ভেনেজুয়েলা নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে গণতন্ত্রের চেয়ে তেলের হিসাবই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ২৮ আগস্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে।

হোয়াইট হাউস এই চুক্তিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেলচুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। গত ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সরকারি বিবরণে বলা হয়েছে, North American Blue Energy Partners (NABEP) নামের একটি বেসরকারি কোম্পানিকে ১৭টি তেলক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অধিকার দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবস্থায় মার্কিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও পরিচালনাগত অধিকার থাকবে।

মাদুরোকে সরানোর পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক বিরোধী নেতৃত্বকে ক্ষমতায় বসায়নি। বরং মাদুরোরই সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের নীতির প্রথম বৈপরীত্যকে স্পষ্ট করে তোলে।

মার্কিন সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তি হলো, আগে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করতে হবে এবং অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে হবে। এরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওয়াশিংটন এখনো বলছে, ভেনেজুয়েলা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত নয়।

রদ্রিগেজও গত ২ সেপ্টেম্বর বলেছেন, নির্বাচন তখনই হবে যখন দেশ ‘প্রস্তুত’ হবে। তার অন্তর্বর্তী মেয়াদ নিয়ে ইতিমধ্যে সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। এটি গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হিসেবে স্থিতিশীলতা নাকি স্থিতিশীলতার নামে গণতন্ত্রের বিলম্ব, সেই প্রশ্ন তৈরি করেছে।

গত জুনে ভেনেজুয়েলায় একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ধীর ও বিশৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখেন এবং দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

তবে ওয়াশিংটন তাকে সমর্থন করার পরিবর্তে রদ্রিগেজের ওপর আস্থা বজায় রাখে। যে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক করার কথা বলা হচ্ছে, সেই রাষ্ট্র যদি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগেও কার্যকরভাবে সাড়া দিতে না পারে, তাহলে শুধু শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তন করে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কীভাবে পুনর্গঠিত হবে, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

ভেনেজুয়েলার সমস্যা শুধু মাদুরো নন, সমস্যাটি আরও গভীরে। দুর্বল প্রতিষ্ঠান, ক্ষয়প্রাপ্ত অবকাঠামো, রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, দুর্নীতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকট এর কারণ। একজন প্রেসিডেন্টকে সরানো আর একটি রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা এক জিনিস নয়।

ভেনেজুয়েলার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুদের একটি বিশাল অংশ রয়েছে। তবে মাটির নিচে তেল থাকা এবং সেই তেল থেকে অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করা এক নয়। ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি, অবকাঠামোগত অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ক্ষতিগ্রস্ত।

বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১.২৫ মিলিয়ন ব্যারেল, যা ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে প্রায় ৩ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছিল। তাই ট্রাম্পের চুক্তিকে শুধু ‘তেল দখল’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা যাবে না। ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলন বাড়াতে বিপুল মূলধন, প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, পাইপলাইন, বন্দর, শোধনাগার এবং রাজনৈতিক নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...