জাতীয়

বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় ২ লাখ টন ফার্নেস তেল চাইল পিডিবি

বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় ২ লাখ টন ফার্নেস তেল চাইল পিডিবি
বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় ২ লাখ টন ফার্নেস তেল চাইল পিডিবি
গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে ২ লাখ ৪ হাজার ১০০ টন ফার্নেস তেল চেয়েছে। বিপিসি এই বিপুল চাহিদা মেটাতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

গ্যাসের সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি মেটাতে ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সেপ্টেম্বর মাসে এসব কেন্দ্র থেকে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। এ জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে ২ লাখ ৪ হাজার ১০০ টন ফার্নেস তেল চেয়েছে পিডিবি। জরুরি ভিত্তিতে এই তেল চাওয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি ৫৩টি কেন্দ্রের জন্য, যেগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ৫ হাজার ৫৩৮ মেগাওয়াট।

বিপিসি সূত্র অনুযায়ী, এত বিপুল চাহিদা মেটানো সহজ হবে না। সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে সব খাত মিলিয়ে বিপিসি ৩১ হাজার ৯০২ টন ফার্নেস তেল বিক্রি করেছে। ৫ সেপ্টেম্বর দিন শেষে সরবরাহযোগ্য মজুত ছিল ১৪ হাজার ৭৫১ টন। মাসের বাকি সময়ে ১ লাখ টন আমদানি এবং স্থানীয় উৎস থেকে ২৫ হাজার টন তেল পাওয়ার কথা রয়েছে।

বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো সেপ্টেম্বরে মোট সরবরাহযোগ্য ফার্নেস তেলের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৫৩ টন। শিল্পকারখানাসহ অন্য খাত বাদ দিয়েও পিডিবির একার চাহিদাই এর চেয়ে ৩২ হাজার ৪৪৭ টন বেশি। গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলো বাড়তি ফার্নেস তেল কিনছে, ফলে ফার্নেস তেলের বিক্রি অস্বাভাবিক বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনে দৈনিক গড়ে ৬ হাজার ৩৮০ টন তেল বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের (২ হাজার ১৭৭ টন) প্রায় তিন গুণ।

বিদ্যুতের পরিস্থিতি ফার্নেস তেলের সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৬১৯ মেগাওয়াট। ওই সময়ে সরবরাহ করা গেছে ১৪ হাজার ৩৬১ মেগাওয়াট, ফলে ২ হাজার ২৫৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফার্নেস তেলের সরবরাহ নিয়ে গত ৩ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ একটি সভা করে। ওই সভায় সরকারি তেল কোম্পানি পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, পিডিবি শুরুতে সেপ্টেম্বরের জন্য ৮৪ হাজার টন ফার্নেস তেলের চাহিদা দিয়েছিল। পরে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলে চাহিদা দুই লাখ টনের বেশি হয়। তিনি আরও জানান, একসঙ্গে এত তেল দেওয়া সম্ভব নয়, তাই ধাপে ধাপে সরবরাহের বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে।

দেশে মোট ৬৫টি ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। আগস্টের শেষ দিকে রাতে এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার এবং দিনে দেড় থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছিল। গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছিল না। আগস্টের শেষ দিকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল। ২৭ আগস্ট দেশের ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টির উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ২০টি পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ওই দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট এবং ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কম ছিল।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, বিপিসির কাছে কিছু ফার্নেস তেল মজুত আছে। কয়েকটি তেলবাহী জাহাজও পথে রয়েছে এবং আরও একটি জাহাজ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে পিডিবির চাহিদার কাছাকাছি পরিমাণ তেল চলতি মাসের মধ্যে জোগাড় করা সম্ভব বলে বিপিসি তাঁদের জানিয়েছে। তবে সব তেল একসঙ্গে লাগবে না, ধাপে ধাপে পেলেই কেন্দ্রগুলো চালানো যাবে। পিডিবির ২ লাখ ৪ হাজার ১০০ টনের হিসাবটি শুধু বিপিসির মাধ্যমে তেল নেবে—এমন কেন্দ্রগুলোর জন্য, যেসব বেসরকারি কেন্দ্র নিজেরা ফার্নেস তেল আমদানি করে, তাদের চাহিদা এই হিসাবে নেই।

পিডিবির তালিকায় সবচেয়ে বেশি ফার্নেস তেল চাওয়া হয়েছে বিআর পাওয়ারজেন লিমিটেডের (বিআরপিএল) তিন কেন্দ্রের জন্য। শ্রীপুরে ১৪ হাজার, কড্ডায় ১৩ হাজার এবং মিরসরাইয়ে ৮ হাজার টন—তিন কেন্দ্র মিলিয়ে চাহিদা ৩৫ হাজার টন। বিআরপিএলের নির্বাহী পরিচালক গোবিন্দ চন্দ্র লাহা জানান, শ্রীপুর ও কড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিটিতে দৈনিক গড়ে প্রায় ৮০০ টন করে ফার্নেস তেল প্রয়োজন। মিরসরাইয়ে তেল নিতে হয় সড়কপথে, সেখানে তিনটি ঠিকাদার নিয়োজিত থাকলেও দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০০ টন তেল নেওয়া সম্ভব।

গোবিন্দ চন্দ্র লাহা বলেন, তিনটি কেন্দ্রই চালু আছে। তবে উৎপাদন নির্ভর করে জাতীয় লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের চাহিদা ও তেলের প্রাপ্যতার ওপর। গত মাসের শেষ দিকে তেলের কিছুটা ঘাটতির কারণে কিছু সময় কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যায়নি। তিনি আরও জানান, গত বছর প্রতি লিটার ফার্নেস তেলের দাম ছিল প্রায় ৭১ টাকা, এখন তা প্রায় ১০০ টাকা। ফলে তেলচালিত কেন্দ্র বেশি চালিয়ে লোডশেডিং কমানো গেলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে। সাগরে বড় ট্যাংকার থেকে সরাসরি পাইপে জ্বালানি তেল খালাসের প্রকল্প এখনো চালু না হওয়ায় হঠাৎ ফার্নেস তেলের চাহিদা দ্বিগুণ-তিন গুণ হয়ে গেলে দ্রুত আমদানি বাড়ানো বিপিসির জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...