অর্থনীতিভোলার গ্যাস পরিবহনে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে জ্বালানি বিভাগ
ভোলার গ্যাস পরিবহনে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে জ্বালানি বিভাগ
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ভোলা থেকে গ্যাস পরিবহনে সহজ পাইপলাইন বাদ দিয়ে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলএনজি/সিএনজি পদ্ধতি বেছে নিচ্ছে, যা রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিতে পারে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ভোলা থেকে গ্যাস পরিবহনে সহজ ও নির্ভরযোগ্য পথ বাদ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল একটি পদ্ধতি অনুসরণ করছে। দ্বীপজেলা ভোলার গ্যাস আনতে এক হাজার ৯৩১ কোটি টাকার পাইপলাইন নির্মাণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই পথে রাষ্ট্রের কয়েক হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইপলাইনের মাধ্যমে যখন ৩০ টাকায় গ্যাস পাওয়া যায়, সেখানে শুধু পরিবহন খরচই ৩০ টাকার বেশি গুণতে হচ্ছে। পাইপলাইন দিয়ে কয়েক দশক ধরে অনেক বেশি পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। সেই পথ বাদ দিয়ে এলএনজি অথবা সিএনজি আকারে গ্যাস আনতে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে।
৩০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আনতে ১০ বছরে কমপক্ষে নয় হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সময় ও পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে খরচও বৃদ্ধি পাবে। কিছু কমিশনভোগীর স্বার্থে ব্যয়বহুল এবং বিপজ্জনক পথেই পেট্রোবাংলা এগোচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কিছু কমিশনভোগী বিগত সরকার আমল থেকেই সক্রিয় ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নতুন মুখ যুক্ত হওয়ায় দেশের স্বার্থ গৌণ হয়ে পড়ে। দ্রুত এলএনজি আকারে গ্যাস আনা সম্ভব, যা পাইপলাইনে সম্ভব নয় — এমন উদ্ভট যুক্তি তখন সামনে আনা হয়েছিল।
ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস নিয়ে প্রায় তিন দশক ধরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিকে ধাবিত হচ্ছে। কখনও সিএনজি, কখনও এলএনজি, আবার কখনও পাইপলাইনের পেছনে তাদের ছুটতে দেখা যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করে। এ জন্য কয়েক দফায় ফিল্ড ভিজিটসহ অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সে সময়ে বেশ কিছু দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠান মন্ত্রণালয়ে আগ্রহ দেখিয়ে চিঠি দেয়।
তবে পরিবহন খরচসহ সার্বিক বিবেচনায় এটি লাভজনক না হওয়ায় পরে পাইপলাইনের তোড়জোড় শুরু হয়। এলএনজি আকারে গ্যাস আনা অনেকটাই ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে গ্যাসফিল্ডের জন্যও এটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এলএনজি আকারে আনার জন্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে, গ্যাস কূপ থেকে থেমে থেমে উত্তোলন করাও কারিগরিভাবে বিপজ্জনক। এতে কূপ, এমনকি গ্যাসফিল্ডের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
ভোলা থেকে সিএনজি আকারে পাঁচ মিলিয়ন গ্যাস সরবরাহের একটি চুক্তি বিদ্যমান। প্রতি ঘনমিটারে পরিবহন খরচ ৩০.৬০ টাকাসহ গ্যাসের দাম ৪৭.৬০ টাকা দাঁড়াচ্ছে, যা পাইপলাইনে সরবরাহ করা গ্যাসের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ।
সিএনজিতে ৪৭.৬০ টাকা হলেও এলএনজি আকারে আনতে ৫৫ টাকার মতো খরচের প্রস্তাব এসেছে। এলএনজি বেশি পরিমাণে আনা গেলেও প্রথমে ভোলাতে এটিকে এলএনজি করতে হবে। এরপর নারায়ণগঞ্জে (প্রস্তাবিত) এনে আবার রিগ্যাসিফিকেশন করতে হবে।
এলএনজি আকারে আনার জন্য খরচ নির্ধারণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে সিএনজির পরিবহন খরচের সমান প্রস্তাব করা হয়েছিল।
পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে পরিবহন খরচসহ ওই এলএনজির দাম ৪৭.৫০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে নয় হাজার ৩০০ কোটি টাকার খরচ প্রাক্কলন করা হয়। অথচ অনেক কম খরচে স্থায়ী সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল হয়ে খুলনা ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকা দরকার। গ্যাস মজুদ বেশি না থাকলে পাইপলাইনের খরচ উঠবে কিভাবে, অর্থায়নে নিশ্চয়তা চাইবে ঋণদাতারা। ২০০৪ সালে পাইপলাইন নির্মাণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সেই গ্যারান্টি চাইলে প্রকল্পটি ভেস্তে যায় তখন।
এরপর দুই দশক ধরেই নানা আলোচনা চলমান। এরই মধ্যে দুই দফায় রুট বদলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিগত সরকার তার ঘনিষ্ঠ একটি কোম্পানির সঙ্গে দৈনিক পাঁচ মিলিয়ন সিএনজি আকারে আনার চুক্তি করেছিল। যদিও গড়ে তিন মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি কখনই সরবরাহ দিতে পারেনি কোম্পানিটি।
তখন নির্বাহী আদেশে গ্যাসের দাম ১৭ টাকা এবং পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাবদ ৩০.৫০ টাকাসহ ৪৭.৫০ টাকা চুড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, সম্প্রতি এলএনজি, সিএনজি অথবা আইএসও ট্যাংকারে করে গ্যাস আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নদীপথে এনে ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা হবে। যে কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তারা ভোলা থেকে গ্যাস কিনে নির্ধারিত দরে আগ্রহী শিল্প কারখানায় সরবরাহ করবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মেঘনা শিপ অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, চায়না ন্যাশনাল মেশিনারী ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন, চাংকিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড এবং জিসিজি এলএনজি পরিবহনের কাজ পেতে প্রস্তাব জমা দেয়।
অন্যদিকে, তিতাস গ্যাসের অধিভুক্ত এলাকায় ৩২টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তাদের মোট গ্যাসের চাহিদা ১৫.১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এই কোম্পানিগুলো ৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে।
মতামত (0)