বিনোদন

বলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব: খরচ হ্রাস ও কর্মসংস্থান সংকট

বলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব: খরচ হ্রাস ও কর্মসংস্থান সংকট
বলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব: খরচ হ্রাস ও কর্মসংস্থান সংকট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণে খরচ ৩০% কমিয়ে আনছে এবং সময় বাঁচাচ্ছে, তবে এর ফলে ভিএফএক্স শিল্পী ও সম্পাদকদের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে।

ভারতে চলচ্চিত্র নির্মাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই প্রযুক্তির ব্যবহার চলচ্চিত্র শিল্পের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। এর ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ এক ধাক্কায় অন্তত ৩০ শতাংশ কমে আসছে বলে শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন। একই সাথে শুটিংয়ের মূল্যবান সময়ও বাঁচছে, যা আগে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ছিল।

পূর্বে চিত্রনাট্যে কানাডার বরফাবৃত সুবিশাল পর্বতমালা অথবা ১৯৩০ সালের বুদাপেস্ট শহরের ব্যস্ত পথঘাটের মতো দৃশ্যের প্রয়োজন হলে নির্মাতাদের বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতো। সীমিত বাজেট এবং দূরবর্তী শুটিং স্পটে যাওয়ার অসম্ভবতা অনেক সময় প্রকল্পের কাজ থামিয়ে দিত। এমন পরিস্থিতিতে নির্মাতাদের বিপুল অঙ্কের অর্থ গুনতে হতো, যা এখন এআই সমাধান করে দিচ্ছে এবং নির্মাণ প্রক্রিয়াকে সহজ করছে।

ভারতের চণ্ডীগড়ে ‘মহারাজা ইন ডেনিমস’ বই অবলম্বনে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়াল কম্পিউটার স্ক্রিনে প্রদর্শিত হচ্ছে। এই ভিজ্যুয়ালগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। এটি চলচ্চিত্র নির্মাণে এআইয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগের একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যা জটিল দৃশ্যগুলোকে ডিজিটাল মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে।

প্রযোজক আরফি লাম্বা সম্প্রতি মুম্বাইয়ের স্টুডিওতে বসেই এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ছবির কাজ করেছেন। তিনি ইতালির আল্পস পর্বতমালার সাধারণ দৃশ্যকে কানাডার তুষারাবৃত পাহাড়ে রূপান্তর করেছেন। এই প্রযুক্তি তাঁকে দূরবর্তী স্থানের দৃশ্য ধারণের ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া এড়াতে এবং স্টুডিওর ভেতরেই আন্তর্জাতিক মানের ভিজ্যুয়াল তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

লাম্বা জানান, বুদাপেস্টের একটি সেটকে পুরোনো দিনের রূপ দিতে সাধারণ ভিএফএক্স টিম দিয়ে কাজ করালে যেখানে অন্তত ১৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার ইউরো খরচ হতো, এআই দিয়ে মাত্র ১৫ শ ইউরোর মধ্যে সে কাজ নিখুঁতভাবে শেষ করা গেছে। এটি এআই ব্যবহারের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য খরচ কমানোর একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ, যা নির্মাতাদের বাজেট নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছে।

চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভারতীয় বিনোদনজগতে এআইয়ের ব্যবহার এখনও কেবল প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের খ্যাতনামা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইরোস ইন্টারন্যাশনাল এবং জিও স্টুডিওস দীর্ঘদিন ধরে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। ইরোস ইন্টারন্যাশনাল পুরোপুরি এআই-ভিত্তিক চলচ্চিত্রপ্রক্রিয়ার দিকে ঝুঁকছে বলেও জানা গেছে, যা এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নির্দেশ করে।

চিত্রনাট্যের ভুলত্রুটি ধরা থেকে শুরু করে ডাবিং, কালার গ্রেডিং এবং সম্পাদনার কাজ দ্রুত শেষ করতে নানা এআই টুলস চালু হয়েছে। এই টুলসগুলো পোস্ট-প্রোডাকশনের বিভিন্ন ধাপে সময় ও শ্রম সাশ্রয় করছে। এটি চলচ্চিত্র নির্মাণের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন করে তুলছে।

হাইপারকগ টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা রঞ্জিত কুমারের মতে, সিনেমায় এআইয়ের সম্ভাব্য ক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশ এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি মনে করেন, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বাকি ৯০ শতাংশ প্রযুক্তির বিকাশ ঘটবে। এই বিকাশ চলচ্চিত্র শিল্পকে পুরোপুরি বদলে দেবে এবং নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেছেন।

তবে এআইয়ের এই ব্যাপক ব্যবহারের একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে, যা হলো কর্মসংস্থান হ্রাস। ভিএফএক্সশিল্পী, চিত্রসম্পাদক এবং সহকারী পরিচালকদের মতো অনেক পেশাদারদের কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেড়ে নিচ্ছে। এর ফলে শিল্পের সঙ্গে জড়িত কলাকুশলীরা চরম সংকটে পড়েছেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অনেক কলাকুশলী কাজ হারিয়ে ভিন্ন পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে মানবসম্পদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা শিল্পে জড়িত মানুষের জীবিকার উপর সরাসরি আঘাত হানছে। শিল্পের একটি বড় অংশ এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

প্রযুক্তির এমন বিকাশ সত্ত্বেও চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতারা বিশ্বাস করেন যে, মানুষের আবেগ ও মৌলিকতার জায়গা এআই কখনো নিতে পারবে না। চিত্রনাট্যকার সুধাকর একলব্যে বলেছেন, এআই দিয়ে একটি সাধারণ বা ভালো চিত্রনাট্য তৈরি করা সম্ভব হলেও মানুষের তৈরি অনবদ্য ও কালজয়ী গল্প উপহার দেওয়া এআইয়ের পক্ষে অসম্ভব। মানবিক সৃজনশীলতা এআই দ্বারা প্রতিস্থাপন করা কঠিন বলে তিনি মনে করেন।

প্রযোজকেরা অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, কেবল এআই চরিত্র দিয়ে তৈরি ছবিগুলো মানবিক অনুভূতি ও বৈচিত্র্যের অভাবে দ্রুতই দর্শকের কাছে একঘেয়ে হয়ে পড়ে। মানুষের তৈরি গল্পের গভীরতা এবং চরিত্রগুলোর মানবিক দিক দর্শককে বেশি আকৃষ্ট করে, যা এআই চরিত্রের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকতে পারে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...