সারাদেশ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকটে ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকটে ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকটে ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম
শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকটে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে ৬৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক পাঠদান করছেন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক–সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে পাঠদানে শিক্ষকেরা হিমশিম খাচ্ছেন। প্রতিবছর শিক্ষার্থী বাড়লেও সেই অনুপাতে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়েনি।

বর্তমানে ৪৮ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে গড়ে একজন শিক্ষক পাঠদান করেন। তবে অর্ধশতাধিক শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে থাকায় এই অনুপাত ৬৯:১ এ দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ ও আবাসনসংকটও রয়েছে।

শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা উচ্চশিক্ষায় মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশের জন্য ১:২০ শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতকে কাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করেন। তবে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এটি সর্বজনীন বাধ্যতামূলক অনুপাত হিসেবে নির্ধারণ করেনি।

২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি ছয়টি বিভাগ এবং ৪০০ শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে ২৫টি বিভাগে স্নাতক এবং ২৪টি বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ২১০ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। তাঁদের মধ্যে ৬২ জন উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। নিয়মিত পাঠদান করছেন ১৪৮ জন শিক্ষক।

মোট ১০ হাজার ১৪৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে গড়ে ৬৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক পাঠদান করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির জনবলকাঠামো অনুযায়ী, অধ্যাপক পদের সংখ্যা ৪৯টি হলেও বর্তমানে অধ্যাপক আছেন মাত্র একজন।

শিক্ষক পদের সংখ্যা ৪০১টি। এর মধ্যে ইউজিসির অনুমোদন রয়েছে ২৬০টি পদের। বর্তমানে ২১০ জন কর্মরত থাকায় অনুমোদিত পদের বিপরীতেও ৫০টি শিক্ষক পদ খালি রয়েছে। শিক্ষক-সংকট কেবল শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নেই, গবেষণা, উচ্চশিক্ষা তত্ত্বাবধান এবং একাডেমিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে।

১৬ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দেখা যায়, বাংলা বিভাগের সম্মান চতুর্থ বর্ষের একটি ক্লাস নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা আগেই শেষ করা হয়। ওই কক্ষে বিভাগটির স্নাতকোত্তর শ্রেণির একটি পরীক্ষা চলছিল। সম্মান চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রাজিব জানান, কক্ষ–সংকটের কারণে এমন ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম বলেন, তাঁদের বিভাগে সাতটি ব্যাচে চার শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের জন্য শিক্ষক আছেন মাত্র চারজন। এত শিক্ষার্থীকে পাঠদান, গবেষণা (থিসিস) ও শিক্ষাবিষয়ক অন্য কাজগুলো করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শিক্ষকেরা উল্লেখ করেন, একজন শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ছাড়াও পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের গবেষণা তত্ত্বাবধান, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও বিভিন্ন কমিটির কাজ করতে হয়। এর ফলে কাগজে-কলমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত যা দেখা যায়, বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষকের ওপর চাপ আরও বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মামুন অর রশিদ জানান, শিক্ষক–সংকট বেশ ভোগাচ্ছে। এই বিষয়টি এরই মধ্যে ইউজিসিকে জানিয়ে আবেদন করা হয়েছে এবং তারা কিছু শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছে।

বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মৃত্যুঞ্জয় রায় জানান, তাঁদের বিভাগের দুটি শ্রেণিকক্ষ আছে। এর মধ্যে একটি তাদের নিজস্ব এবং আরেকটি ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। প্রতি সেমিস্টারে ৩০ থেকে ৩৫টি ক্লাস থাকে, যা কক্ষ–সংকটের কারণে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত করছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২৫টি বিভাগের প্রায় ১৫০টি ব্যাচের পাঠদান পরিচালনার জন্য অন্তত ৭৫টি শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন। এর বিপরীতে বর্তমানে ৩৬টি শ্রেণিকক্ষ আছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, এই ঘাটতির কারণে বিভিন্ন বিভাগকে একই শ্রেণিকক্ষ ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হচ্ছে।

এক ব্যাচের ক্লাস শেষ হলে অন্য ব্যাচকে ক্লাস করাতে হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ক্লাসের সময় পরিবর্তন করতে হচ্ছে। শিক্ষক-সংকটে একদিকে ক্লাসের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষের অভাবে নির্ধারিত সময়ে ক্লাস নেওয়া যাচ্ছে না। এর ধারাবাহিক প্রভাব পড়ছে পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে, যা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে চারটি আবাসিক হল রয়েছে। ছাত্রদের জন্য শেরেবাংলা হল ও বিজয়-২৪ হল এবং ছাত্রীদের জন্য সুফিয়া কামাল হল ও রাবেয়া বসরী হল। এই চারটি হলে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের সুযোগ আছে। মোট শিক্ষার্থীর হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম বলেন, তাঁদের বিভাগে মাত্র পাঁচজন শিক্ষক আছেন। এই অল্পসংখ্যক শিক্ষকের পক্ষে পাঁচটি ব্যাচের পাঠদান অসম্ভব। এর ফলে তাঁদের সেশনজট বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...