জাতীয়

বস্তিবাসীর আবাসন সমস্যা সমাধানে 'থাই মডেল' নিয়ে আলোচনা

বস্তিবাসীর আবাসন সমস্যা সমাধানে 'থাই মডেল' নিয়ে আলোচনা
বস্তিবাসীর আবাসন সমস্যা সমাধানে 'থাই মডেল' নিয়ে আলোচনা
শহরের বস্তিবাসীর আবাসন সমস্যা সমাধানে থাইল্যান্ডের একটি মডেল নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেখানে সরকার সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করে এবং দরিদ্র মানুষ নিজেদের আবাসন নিজেরাই তৈরি করেন।

শহর অঞ্চলে বস্তি গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ হলো জীবনযাপনের পেছনে কম খরচ করে বেশি রোজগার করে নিজের অবস্থার উন্নতি করার মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। এসব বস্তি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হয়। বস্তির বাসিন্দারা প্রায়শই নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ শহরের প্রান্তিক মানুষ বা বস্তিবাসীর আবাসন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনেক বড় দেশ গণ-আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করে আবাসন সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়। ব্রিটেনের ‘পার্ক হিলস’, ফ্রান্সের ‘গ্রান্দ এসেম্বলেস’, জাপানের ‘দানচি’, রাশিয়ার ‘ক্রুশ্চেভকা’, জার্মানির ‘প্লাটেনবাউ’, আমেরিকার ‘কো-অপ সিটি’ এবং ব্রাজিলের ‘সুপারকোয়াড্রা’ এর মতো প্রকল্পগুলো এর উদাহরণ।

এই প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই কেন্দ্রীয়ভাবে বা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছিল। এদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কম খরচে এবং সীমিত জায়গায় সর্বাধিক সংখ্যক মানুষকে আবাসন সুবিধা দেওয়া। তবে, এই প্রকল্পগুলোর একটি সাধারণ সমস্যা ছিল সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার স্থানের অভাব, যা অনেক সময় সেগুলোকে অপরাধপ্রবণ স্থানে পরিণত করেছিল। আমেরিকার প্রুইত ইগো প্রকল্পটি নির্মাণের ২০ বছরের মধ্যেই ভেঙে ফেলা হয়।

জাপান, আমেরিকা বা রাশিয়ার মতো দেশগুলো নিজস্ব সরকারি অর্থায়নে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল। এই ধরনের বিনিয়োগ থেকে রাষ্ট্র সরাসরি কোনো নগদ মুনাফা অর্জন করে না। যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে এবং জাতীয় উৎপাদন বাড়াতে এই দেশগুলোর প্রচুর শহুরে শ্রমজীবীর প্রয়োজন ছিল। এই শ্রমজীবীদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে কম খরচে গণ-আবাসন তৈরি করা হয়।

সরকার যখন মানুষকে বাড়ি বানিয়ে দেওয়ার মতো বিশাল ও জটিল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়, তখন প্রায়শই সহজতম পথ খুঁজে সমাধান করার চেষ্টা করে। এর ফলে নিম্ন আয়ের বসতির সামাজিক জটিলতাকে সঠিকভাবে বিবেচনা করা হয় না, যা ভুল সিদ্ধান্তের দিকে পরিচালিত করে।

দুর্বল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর দেশগুলোতে গণ-আবাসন প্রকল্পগুলোর আরেকটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়। রাষ্ট্র কর্তৃক বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণের অর্থে নির্মিত আবাসনগুলো বস্তিবাসীরা বরাদ্দ পাওয়ার পর বেশি দামে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল মানুষের কাছে বিক্রি বা ভাড়া দিয়ে আবার অন্য কোনো বস্তিতে ফিরে যান।

কেনিয়ার ‘কিবেরা স্লাম আপগ্রেডেশন’, ব্রাজিলের ‘পোরতো মারাভিলা’, কম্বোডিয়ার ‘বোয়েং কাক লেক রিক্লেমেশন’, মুম্বাইয়ের ‘ধারাভি রিডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ এবং বাংলাদেশের ভাষানটেক প্রকল্প এর উদাহরণ। এমনকি সাম্প্রতিক বাউনিয়া বাঁধের ভাড়াভিত্তিক বস্তি উন্নয়ন প্রকল্পেও একই ধরন দেখা যায়। এসব দেশে বৈধ সাশ্রয়ী আবাসনের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম থাকে।

বসবাসের অযোগ্য বস্তিগুলোতে সরকার যখন ন্যূনতম নিয়মকানুন মেনে আবাসন নির্মাণ করে, তখন সেই আবাসন অনেক ক্ষেত্রেই অন্য কোনো জায়গার মাঝারি মানের বেসরকারি আবাসনের চেয়ে উন্নত হয়। এসব আবাসনে খোলা জায়গা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, আলো-বাতাস, কমিউনিটি স্পেস, বাজার, খেলাধুলার জায়গা, স্কুল এবং হাসপাতাল ইত্যাদি সুবিধা থাকে। এর ফলস্বরূপ জেন্ট্রিফিকেশন ঘটে, অর্থাৎ দরিদ্র মানুষের জায়গায় অপেক্ষাকৃত সচ্ছল চাকরিজীবী, ছাত্র বা ছোট পরিবার এসে বসবাস শুরু করে। মিরপুর ১১ নম্বরের বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ বস্তিবাসীদের জন্য ১৪ তলাবিশিষ্ট ৫টি ভবন নির্মাণ করেছে।

নকশা প্রণয়নের সময় বস্তিবাসীদের মতামত বা চাহিদা প্রায়শই শোনা হয় না। ফলে তৈরি করা পুনর্বাসন প্রকল্পগুলো পুনর্বাসনকৃতদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। জীবিকা নির্বাহের কার্যকলাপ একটি বস্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বস্তিতে প্রায় অদৃশ্য এবং সূক্ষ্ম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে, যা ছাড়া বস্তি অচল হয়ে পড়ে। এখানে একটি পেঁয়াজ বা কয়েকটি মরিচ কেনা এবং বিক্রি করা প্রয়োজন। শিশু বা বৃদ্ধাকে বিনা খরচে ও নিরাপদে বস্তিতে রেখে কাজে যেতে পারা প্রয়োজন। হেঁটে বা অতি অল্প ভাড়ায় কাজের জায়গায় যাওয়া ও ফিরে আসার সুযোগ থাকা জরুরি।

দাতার টাকায় নির্মিত পুনর্বাসন প্রকল্পগুলোতে এসব প্রয়োজনীয়তা প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে। যারা নকশা করেন বা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, তাদের বস্তির মানুষের সঙ্গে মিশে কাজ করার অভিজ্ঞতা সাধারণত কম থাকে। এ কারণে তাদের নিজেদের জীবনযাত্রার মান পুনর্বাসন প্রকল্পে প্রতিফলিত হয়।

বিপুল অর্থলগ্নি বা বৈদেশিক ঋণসহায়তা ছাড়া দেশের প্রান্তিক মানুষের আবাসন সমস্যা সমাধান করা সম্ভব কিনা, এই প্রশ্ন উঠেছে। থাইল্যান্ড দেখিয়েছে এটি সম্ভব। থাইল্যান্ড সরকার বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য ঘর বানিয়ে দেওয়ার কঠিন চিন্তা থেকে সরে এসেছে।

সেখানে দরিদ্র মানুষ নিজের বাসা নিজেই তৈরি করেন, সরকার শুধু তাদের মৌলিক কিছু সহযোগিতা দেয়। প্রথমত, সরকার নির্দিষ্ট শর্ত মেনে সরকারি জমিতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (যেমন ২০ থেকে ৩০ বছর) বসবাসের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়, তবে জমির স্বত্ব সরকারেরই থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিগত সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পকে থাইল্যান্ডের এই আদলে রূপান্তর করে উন্নয়নের উদাহরণ তৈরি করা সম্ভব। এতে সারা দেশের আবাসন সমস্যা ধীরে ধীরে মানুষের নিজস্ব অর্থায়নে সমাধান করা যেতে পারে। এই বিষয়ে বর্তমান জনবান্ধব সরকার বিবেচনা করতে পারে বলে মনে করা হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...