স্বাস্থ্য

ছোট অভ্যাসেই কমবে মানসিক চাপ: গবেষণায় নতুন তথ্য

ছোট অভ্যাসেই কমবে মানসিক চাপ: গবেষণায় নতুন তথ্য
ছোট অভ্যাসেই কমবে মানসিক চাপ: গবেষণায় নতুন তথ্য
গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প সময়ের সহজ অনুশীলন, যা ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ নামে পরিচিত, মেজাজ ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে। এর মধ্যে লাফটার ইয়োগা, হালকা স্ট্রেচিং এবং গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস উল্লেখযোগ্য।

গবেষণায় দেখা গেছে, খুব অল্প সময়ের কিছু সহজ অনুশীলন মেজাজ ও মানসিক ভালো থাকার ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। এসব অনুশীলনকে ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ বলা হয়, যা করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে। ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ বইয়ের লেখক এলি সাসম্যানের মতে, ভালো থাকার জন্য কখনো কখনো ৩০ সেকেন্ডের একটি ছোট অনুশীলনই যথেষ্ট। মন খারাপ, মানসিক চাপ বা অস্থিরতা কাটাতে নিজের জন্য একটু সময় বের করার কথা প্রায়ই বলা হয়।

ব্যস্ত দিনের মধ্যে ধ্যান, যোগব্যায়াম বা অন্য কোনো সেলফ-কেয়ার অভ্যাসের জন্য আলাদা করে সময় বের করা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না। তবে অল্প সময়ের এসব অনুশীলন মন ভালো রাখার সুযোগ তৈরি করে। এর মধ্যে একটি হলো ‘লাফটার ইয়োগা’ বা হাসির যোগব্যায়াম। হাসির জন্য সবসময় মজার কোনো ঘটনা বা কৌতুকের প্রয়োজন হয় না।

‘লাফটার ইয়োগা’ পদ্ধতিতে কোনো কৌতুক ছাড়াই ইচ্ছা করে হাসি শুরু করা হয়। নেদারল্যান্ডসের ডেলফট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক নাটালি ভ্যান ডের ওয়ালের সঙ্গে কথা বলার সময় একজন প্রতিবেদক একটি ছোট লাফটার ইয়োগা সেশনে অংশ নেন। শুরুতে শ্বাসের ব্যায়ামের পর ভ্যান ডের ওয়ালের নির্দেশনায় তিনি কৃত্রিমভাবে হাসতে শুরু করেন। শুরুতে বিষয়টি কিছুটা অস্বস্তিকর লাগলেও কিছুক্ষণ পর সেই কৃত্রিম হাসিই সত্যিকারের হাসিতে পরিণত হয়।

অনুশীলন শেষে ওই প্রতিবেদক মন প্রফুল্ল ও ভালো লাগার কথা জানান। এমনকি তার কথাবার্তাও সহজ হয়ে আসার অভিজ্ঞতা হয়। ভ্যান ডের ওয়াল বলেন, লাফটার ইয়োগার পর অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করাও অনেক সময় সহজ মনে হয়। এই হাসির প্রভাব নিয়ে গবেষণায় কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ভ্যান ডের ওয়ালের করা একটি বড় মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, কৌতুকবিহীন হাসি বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমাতে কৌতুক বা মজার বিষয় থেকে আসা হাসির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ কার্যকর।

এই ইয়োগা অনুশীলনের জন্য প্রথমে তিনবার গভীর শ্বাস নিতে হয়। এরপর পেটের ওপর হাত রেখে ইচ্ছা করে হাসতে শুরু করতে হয়। শুরু করতে অসুবিধা হলে ‘হি হি হি’ বা ‘হা হা হা’ বলতে পারেন। ধীরে ধীরে হাসির শব্দ বাড়ালে একসময় সেটি সত্যিকারের হাসিতে পরিণত হতে পারে। শেষে আবার গভীর শ্বাস নিয়ে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া যে বিষয়গুলোর জন্য কৃতজ্ঞ, সেগুলো ভাবতে বলা হয়। সঙ্গী থাকলে দুজন দুজনের হাসি অনুকরণ করে দেখতে পারেন।

একা অথবা আয়নার সামনে হাসতে ভালো না লাগলে ‘মাইক্রো ইয়োগা’ চেষ্টা করা যেতে পারে। যারা দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকেন, তাদের জন্য এ অনুশীলন বিশেষভাবে কাজে আসে। একই ভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় বসে থাকার ফলে শরীরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, সহজ কিছু স্ট্রেচিং তা থেকে মুক্তি দিতে পারে। হালকা স্ট্রেচিং করলে ঘাড়ের টান কিছুটা কমে এবং বসার ভঙ্গির দিকেও মনোযোগ যায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১৫ মিনিট পর মাত্র ১৫-৩০ সেকেন্ড স্ট্রেচিং করলে কাজে মনোযোগ প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে।

অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রেচিংয়ের সঙ্গে গভীর শ্বাস ও মনোযোগ ধরে রাখার অনুশীলন যুক্ত হলে মানসিক চাপ কমাতে তা আরো কার্যকর হতে পারে। মনোযোগ দিয়ে স্ট্রেচিং করার বিরতিগুলো বার্নআউট এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে ভুল কমাতেও সহায়তা করে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে নতুন কোনো ব্যায়াম শুরু করার আগে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত, কারণ সব ধরনের স্ট্রেচিংয়েরই কিছু ঝুঁকি থাকতে পারে। এই স্ট্রেচিংয়ের জন্য পিঠের পেছনে দুই হাতের আঙুল পরস্পর জড়িয়ে নিতে হয়। শ্বাস নেয়ার সময় দুই হাত নিচের দিকে বাড়াতে হয় এবং বুক ধীরে ওপরে তুলতে হয়। শ্বাস ছাড়ার সময় স্ট্রেচিংটি একটু শিথিল করে এভাবে দুই থেকে তিনবার ধীরে শ্বাস নিতে হয়।

চাপ বা উদ্বেগের সময় কয়েকবার ধীর, গভীর শ্বাসও মনকে শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নেয়া শরীরের ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া কমাতে পারে। এটি শরীরের প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় করে, যা শরীরের ‘রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট’ অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় শ্বাসের ব্যায়ামের সঙ্গে চাপ, বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তিনবার ধীরে গভীর শ্বাস নেয়ার পর মস্তিষ্কে আলফা ওয়েভ বাড়ে। এই ওয়েভগুলো শান্ত ও মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

এই অনুশীলনের জন্য আরামদায়ক অবস্থায় বসে চোখ বন্ধ করতে হয়। প্রায় ১০ সেকেন্ড ধরে ধীরে গভীরভাবে শ্বাস নিতে হয়। শ্বাস ছাড়ার সময় শ্বাস নেয়ার চেয়ে একটু দীর্ঘ রাখা উচিত। ফুসফুসে বাতাস ঢোকা ও বের হওয়ার অনুভূতির দিকে মনোযোগ দিতে হয়। দিনে যতবার প্রয়োজন, ততবার এটি করা যেতে পারে। স্পর্শের উপকারিতা নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলছে। অন্য মানুষের স্পর্শের বিকল্প না হলেও নিজের শরীরকে নিজেই আলতো করে ছুঁয়ে শান্ত হওয়াও একটি অভ্যাস।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...