স্বাস্থ্যদেশজুড়ে ১০ হাজার ভুয়া চিকিৎসকের প্রতারণা, কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা
দেশজুড়ে ১০ হাজার ভুয়া চিকিৎসকের প্রতারণা, কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা
সারাদেশে প্রায় ১০ হাজার ভুয়া চিকিৎসক শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বিএমডিসির সনদ ছাড়াই চিকিৎসার নামে প্রতারণা করছেন। লোকবল সংকট ও আইনি জটিলতায় ব্যবস্থা নিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
দেশজুড়ে চিকিৎসার নামে প্রতারণা এবং ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) আইন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের তদারকি এবং আদালতের রায়, এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে পাশ কাটিয়েই এই ধরনের অনিয়ম চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এই পরিস্থিতিকে গুরুতর বলে উল্লেখ করেছেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, দেশে প্রায় ১০ হাজার ভুয়া চিকিৎসক কোনো ধরনের নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা বা বিএমডিসির সনদ ছাড়াই মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য আবশ্যকীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বিএমডিসির নিবন্ধন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে অনেকেই এই নিয়ম মানছেন না। এই কথিত চিকিৎসকরা নিজেদের বিভিন্ন পরিচয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন।
অনুসন্ধানে এমন কথিত চিকিৎসকেরও সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। একজন কথিত ভুয়া চিকিৎসক নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে দাবি করেন যে, তিনি মানবিকে পড়াশোনা করেছেন। তবে তার মতে, মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার পর ডিপ্লোমা করার কারণে তার পড়াশোনা ‘সায়েন্স’ হয়ে গেছে। আরেক কথিত চিকিৎসক নিজেকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ অব কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিনের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেন, যা তাদের প্রতারণার কৌশলকে স্পষ্ট করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের একটি রায়কে ভুলভাবে উপস্থাপন করে এসব প্রতারক সুবিধা নিচ্ছেন। তাদের মতে, নিয়মের বাইরে গিয়ে কেউ চিকিৎসা দিলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। বিএমডিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. লিয়াকত হোসেন নিশ্চিত করেন যে, যেসব ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট রিটটি আসলে খারিজ হয়ে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক না হয়েও চিকিৎসকের পরিচয়ে সেবা দেওয়া একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মন্তব্য করেন, ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিএমডিসির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংস্থাটির গাফিলতিকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি মনে করেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, বিষয়টি সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিষিদ্ধ থাকার পরও কেউ যদি এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যায়, তার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করা আবশ্যক।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, অভিযান পরিচালনা করতে গেলে অনেক সময় অভিযুক্তরা আদালতের রায়ের কথা তুলে ধরে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, বিএমডিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় তারা কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।
বিএমডিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. লিয়াকত হোসেন আরও জানান, ১৯৮৩ সালে যে সংখ্যক জনবল নিয়ে কাউন্সিলের কার্যক্রম চলত, এখনও প্রায় একই সংখ্যক স্টাফ দিয়ে তাদের কাজ করতে হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন আইন পাস হলে বিএমডিসি আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারবে এবং ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও নৈতিক অবস্থান থেকে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও জরিমানা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া অভিযোগ করেন, আদালতকে ভুল তথ্য ও ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে বিভ্রান্ত করে কিছু আদেশ নেওয়া হয়েছে। তিনি মনে করেন, বিএমডিসি এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় চাইলে আদালতের সামনে পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে তুলে ধরে এখনো এই প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। দেশের স্বাস্থ্য খাতে আরেকটি বড় সংকট হলো এমবিবিএস চিকিৎসক ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (MATS) ডিগ্রিধারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ। এই সংকট নিরসন করা গেলে বৈধ চিকিৎসক, বিকল্প ধারার চিকিৎসক এবং ভুয়া চিকিৎসকদের আলাদা করে চিহ্নিত করা সহজ হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
ডা. লিয়াকত হোসেন বলেন, সরকার চাইলে বিকল্প ধারার চিকিৎসকদের জন্য আলাদা কাউন্সিল গঠন করে তাদের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে। তবে তিনি এ ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন। ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, যেসব ডিগ্রি স্বীকৃতির যোগ্য বা যেসব কারিকুলামে প্রয়োজনীয় বিষয় থাকার কথা, বিএমডিসি সেগুলো অনুমোদন করতে পারে। তিনি আরও বলেন, অন্তত যাচাই-বাছাই করে কোনটি নির্ধারিত মান পূরণ করে আর কোনটি করে না, সেটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বর্তমানে এই পুরো বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা রয়েছে।
মতামত (0)