রাজনীতিগুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
গুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল শনিবার একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে তাঁর ৬১ দিনের গুমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও ভারতের মেঘালয়ে উদ্ধারের স্মৃতিচারণা করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল শনিবার গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে নিজের গুমের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা স্মরণ করেছেন। রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠানটি হয়। ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ এর আয়োজন করে। আলোচনার শিরোনাম ছিল, ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাঁদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’।
নিজের ৬১ দিনের গুমের ভয়াবহ স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি বিদেশের মাটিতে পাগল অবস্থায় মারা যাব, আমার পরিবার হয়তো আমার কবরও দেখতে পারবে না—এমন ভয়ও পেয়েছিলাম।’ ভারতে উদ্ধারের পর পরিবারের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগের স্মৃতিও তাঁকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। মুঠোফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সেই মুহূর্তে তাঁর স্ত্রী কীভাবে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন, সেই ঘটনারও স্মৃতিচারণা করেন তিনি।
২০১৫ সালের শুরুর দিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সালাহউদ্দিন আহমদ নিখোঁজ হন। তখন তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের পদে ছিলেন এবং রাজধানীর উত্তরা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন। বিএনপি সে সময় অভিযোগ করেছিল, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাঁকে তুলে নিয়ে গেছে।
৬২ দিন পর, ২০১৫ সালের ১১ মে সিলেটের সীমান্ত লাগোয়া ভারতের মেঘালয়ে শিলংয়ের পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। তখন ভারতের পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, সালাহউদ্দিন শিলংয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করার সময় স্থানীয়দের ফোন পেয়ে তাঁকে আটক করা হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তাঁকে একটি ছোট কক্ষে ৬১ দিন আটকে রাখা হয়েছিল। কক্ষটি প্রায় ৮ ফুট বাই ৪ ফুট আকারের ছিল। সেখানে একটি পানির কল এবং শৌচকার্যের জন্য একটি চিকন ছিদ্র ছিল, যা সম্ভবত নালার সঙ্গে যুক্ত থাকায় দুর্গন্ধ আসত।
মেঝেতে একটি কম্বল বিছানো ছিল, সেটিই তাঁর শোবার জায়গা ছিল এবং একটি বালিশও ছিল। সেখানে স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোর কোনো পরিবেশ ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁকে এক বেলা নাশতা ও দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো, এবং পানিও দেওয়া হতো।
গুম অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেও চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ পাননি, যদিও তাঁর হার্টের সমস্যা ছিল। দরজার বাইরে সব সময় একটি বৈদ্যুতিক পাখা চলত এবং দরজার ওপর সামান্য ফাঁকা জায়গা দিয়ে বাতাস আসত। তিনি মনে করতেন, সেই বাতাস না থাকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দম বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার মতো অবস্থা হতো।
একদিন খাবার দিতে এসে আটককারীরা তাঁর কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা খোলে এবং তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পায়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়।
চোখ বাঁধা অবস্থায় তাঁকে একটি গাড়িতে তোলা হয়, যার দরজা খোলার শব্দ শুনে তিনি সেটিকে মাইক্রোবাসের মতো বলে অনুমান করেন। কয়েক ঘণ্টা গাড়িতে চলার পর একটি জায়গায় থামানো হয় এবং সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করানো হয়। গভীর রাতে আবার গাড়িতে তোলা হয়, এবং তিনি পায়ের স্পর্শ দিয়ে রাস্তার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেন।
পরে জিপের মতো একটি গাড়িতে তাঁকে নেওয়া হয় এবং আরও একটি জায়গায় চোখ বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়। সেখানে তিনি কিছু মানুষের কথাবার্তা শোনেন এবং দীর্ঘ সময় তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। একপর্যায়ে একজন কর্মকর্তা তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন, যা শুনে ওই কর্মকর্তা অবাক হন কারণ সালাহউদ্দিন ৬১ দিন ধরে বাইরের কোনো খবর জানতেন না।
সারা দিন কিছু না খাওয়ায় তিনি খাবার চাইলে তাঁকে নুডলস দেওয়া হয়, এবং হাত বাঁধা অবস্থায় চামচ দিয়ে তাঁকে খেতে হয়। প্রস্রাবের প্রয়োজন হলে অনেক কষ্টে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হতো। আরও কয়েক ঘণ্টা রাখার পর তাঁর চোখ খুলে দেওয়া হয়, তবে যাঁরা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা নিজেদের চোখ ঢেকে রেখেছিলেন, যাতে তিনি তাঁদের চিনতে না পারেন। পরে তাঁকে একটি নির্জন এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন সূর্য ওঠার সময় ছিল এবং পাশে একটি বড় ফাঁকা জায়গা ছিল।
তিনি কয়েকজন মানুষকে দেখে তাঁদের কাছে জায়গাটির পরিচয় জানতে চান এবং হিন্দি ও ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করেন। প্রথমে তাঁরা তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন বা পাগল মনে করেছিলেন। পরে তিনি পাশের একটি বিলবোর্ড দেখে বুঝতে পারেন, তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে আছেন।
তিনি স্থানীয় লোকজনকে পুলিশে খবর দেওয়ার অনুরোধ করলে কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ এসে তাঁকে নিয়ে যায়। পুলিশ তাঁকে একটি থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে, এরপর একটি বেসামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি চিকিৎসককে নিজের পরিচয় ও টেলিফোন নম্বর দিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধ করেন।
পুলিশ তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন ভেবেছিল, তাই তাঁকে একটি মানসিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি একজন মনোরোগ-বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেন এবং আবারও নিজের টেলিফোন নম্বর দিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন। তাঁর ছবিও তোলা হয়, যা পরে প্রকাশিত হয়েছিল।
মতামত (0)