জাতীয়

গুমের সাথে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি

গুমের সাথে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি
গুমের সাথে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে: রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গুমের ঘটনার সাথে জড়িত অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তিনি গতকাল ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা জানান।

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তিনি গতকাল রোববার 'আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬' উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো 'আয়নাঘর' থাকবে না।

গতকাল রোববার বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। রাষ্ট্রপতি তার প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, এই দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সকল পথ চিরতরে বন্ধ করা হবে। গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের একটি পবিত্র দায়িত্ব।

রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস করেন যে সরকার এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, বিগত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম ও গোপন বন্দিশালা 'আয়নাঘর'-এর দুঃসহ থাবা দেশের বুকে চেপে বসেছিল।

যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন বা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছেন, তাদের স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং গুম-খুন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিস্টের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই গুরুতর অপরাধকে সর্বদা অস্বীকার করে গেছে।

রাষ্ট্রপতি জানান, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে সেই ফ্যাসিবাদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগ শাস্তির আওতায় আনতে হবে। গুমকে তিনি এক জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম শুধু একটা মানুষকে কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় প্রিয়জনদের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন, অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বস্তি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। গুম-খুনের মাধ্যমে কার্যত সেই অধিকারগুলোর সবকয়টিকেই একসঙ্গে ভুলুণ্ঠিত করা হয়।

দেশে গুম-খুনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে ভয়ানক ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, সেটিকে রাষ্ট্রপতি জাতীয় ইতিহাসের এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপমানজনক অধ্যায় বলে উল্লেখ করেন। তিনি বিগত ফ্যাসিবাদ আমলে গুমের শিকার ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ব্যারিস্টার আরমান এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ অসংখ্য ভিন্ন মতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি গৃহবধূ ও সাধারণ নাগরিকদের স্মরণ করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের গুম-খুনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এই গুম, খুন, অত্যাচার ও নির্যাতনের বিচার বাংলাদেশের মাটিতেই হবে। রাষ্ট্রপতি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদ বিরোধী সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণকে স্মরণ করেন, যাদের অনেকে গুম-খুনের শিকার হয়েছেন।

তিনি বিশ্বাস করেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। রাষ্ট্রপতি গুমের শিকার পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি ফ্যাসিবাদী আমলে গুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা সানজিদা ইসলাম তুলির কথাও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

রাষ্ট্রপতি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের সংস্কৃতি থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর থাকবে সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ। রাষ্ট্রপতি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী, কতটা ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক এবং তার নাগরিক কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করে, সেটি একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে।

রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব সালাহউদ্দিন আহমদ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার হওয়া পরিবারের সদস্যরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন এবং গুমের ঘটনাসমূহের যথাযথ বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...