শিক্ষাইবিতে ছাত্রদল নেতা কর্তৃক শিবির নেতাকে থাপ্পড়, ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও অস্ত্র মহড়া
ইবিতে ছাত্রদল নেতা কর্তৃক শিবির নেতাকে থাপ্পড়, ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও অস্ত্র মহড়া
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের এক নেতা কর্তৃক ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে থাপ্পড় মারার জেরে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, যেখানে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও দেশীয় অস্ত্র হাতে মহড়া দেখা গেছে।
গতকাল শনিবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলে ছাত্রশিবিরের এক নেতাকে থাপ্পড় মারার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাক্কাধাক্কি, হাতাহাতি এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলীনূর রহমানের বিরুদ্ধে এই থাপ্পড় মারার অভিযোগ উঠেছে। আলীনূর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ভুক্তভোগী কাজী জুহায়ের দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং হল শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, গতকাল দুপুরে পরীক্ষা শেষে কাজী জুহায়ের হলে খাবার খেতে যাচ্ছিলেন। হলের গেট পেরিয়ে করিডরে পৌঁছালে আলীনূর তাকে থাপ্পড় দেন। এ সময় উপস্থিত অন্য শিক্ষার্থীরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে আলীনূর তাদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
থাপ্পড় দেওয়ার পর আলীনূর হলের ২১৭ নম্বর কক্ষে চলে যান। ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
শিবিরের নেতা-কর্মীরা আলীনূরের কক্ষের দিকে এগিয়ে যান এবং কক্ষের জানালার কাচ ভাঙচুর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি হয়। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেন।
প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা পরে হল কার্যালয়ে উভয় পক্ষের নেতাদের নিয়ে আলোচনায় বসেন। এই আলোচনায় ভুক্তভোগী কাজী জুহায়ের উপস্থিত ছিলেন। প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা আলীনূরকে তার কক্ষ থেকে বের করে আনার চেষ্টা করলে শিবিরের নেতা-কর্মীদের উত্তেজনার কারণে তাকে বের করা সম্ভব হয়নি।
একপর্যায়ে ছাত্রদলের নেতারা কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে আবারও কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশি সহায়তায় প্রক্টরিয়াল বডির গাড়িতে করে আলীনূরকে সরিয়ে নেওয়ার সময় শিবিরের কর্মীরা তার ওপর চড়াও হন বলে অভিযোগ করা হয়। তাকে কিলঘুষি মারা এবং গাড়ির কাচ ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে।
এই ঘটনার পর গতকাল বিকেল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেখানে রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র হাতে কয়েকজন বহিরাগতকে মহড়া দিতে দেখা যায়। একই সময়ে জিয়া মোড় এলাকায় লাঠিসোঁটা হাতে শিবিরের নেতা-কর্মীদের অবস্থান করার কথা জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক খুলে দেয়। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কে দেশীয় অস্ত্র হাতে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু নেতা-কর্মীকে অবস্থান করতে দেখা যায়। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন হল ও আজিজ হলের পকেট গেটে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী ও শিবিরের কর্মীদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
কাজী জুহায়ের সাংবাদিকদের কাছে জানান, গতকাল পরীক্ষা শেষে তিনি এক বন্ধুর সঙ্গে হলে যাচ্ছিলেন। পায়ের লিগামেন্টে সমস্যার কারণে ক্রাচে ভর করে আস্তে আস্তে হেঁটে যাওয়ার সময় আলীনূর আচমকা তাকে থাপ্পড় দেন। তার সঙ্গে আলীনূরের আগে কোনো বিরোধ ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কেন এই কাজ করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না।
জুহায়ের আরও বলেন, তিনি হতভম্ব হয়ে কারণ জিজ্ঞেস করলে আলীনূর বলেন, “তুই বেয়াদব, তাই মারছি। যা পারিস করিস। আমার ইচ্ছা হইছে তাই মারছি।” অভিযুক্ত আলীনূর রহমান কাজী জুহায়েরকে বেয়াদব বলা এবং তাকে থাপ্পড় দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদ রুমী জানান, বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রক্টর কার্যালয়ে আলোচনা চলছে।
ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, তাদের হল সেক্রেটারিকে অতর্কিত থাপ্পড় দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ও বাইরে দেশীয় অস্ত্র হাতে মহড়া দিচ্ছে। ইউসুফ আলী দাবি করেন, আগের (নিষিদ্ধ) ছাত্রলীগের রূপে ছাত্রদল ফিরছে। তবে শিবিরের নেতা-কর্মীদের লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. শাহীনুজ্জামান জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেছেন। অস্ত্রের মহড়ার বিষয়টি তার নজরে আসেনি বলেও তিনি দাবি করেন। কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদ বলেন, এখানে দুই পক্ষের মাঝে একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মতামত (0)