আন্তর্জাতিক

ইয়েমেনের লোহিত সাগরে হুথিদের নতুন সামরিক বিজয়

ইয়েমেনের লোহিত সাগরে হুথিদের নতুন সামরিক বিজয়
ইয়েমেনের লোহিত সাগরে হুথিদের নতুন সামরিক বিজয়
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা তাদের নিয়ন্ত্রণকে সুসংহত করেছে, যা ইয়েমেন সরকারের দুর্বলতা প্রমাণ করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা একটি বিস্ময়কর সামরিক বিজয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই অগ্রগতি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুথিদের নিয়ন্ত্রণকে আরও সুসংহত করেছে। এটি প্রমাণ করেছে যে ইয়েমেনের সরকার এখনও হুথিদের পরাজিত করার মতো অবস্থানে নেই।

সৌদি আরব এবং ইয়েমেনি কর্মকর্তারা চলতি বছরজুড়েই হুথিবিরোধী অভিযানের আভাস দিয়ে আসছিলেন। লোহিত সাগরের উপকূলকে সম্ভাব্য একটি স্থান হিসেবে দেখা হয়েছিল, কারণ এখানকার সমতল ভূপ্রকৃতি সরকারের জন্য সুবিধাজনক ছিল এবং সৌদি আরবকে তাদের আকাশ শক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ দিত। এছাড়া, ওই এলাকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হুথিদের ঐতিহ্যগত সমর্থক নয় বলে ধারণা করা হয়েছিল।

লোহিত সাগরের নৌযানে হুথিদের পূর্ববর্তী হামলার কারণে আন্তর্জাতিক সমর্থনও এমন অভিযানে পাওয়া যেত বলে মনে করা হয়েছিল। তবে লোহিত সাগরের উপকূল দখলের মধ্য দিয়ে এসব ধারণাই ভেঙে পড়েছে। এই অগ্রযাত্রা হুথিদের জন্য একটি বড় ধরনের পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হলেও, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে হুমকি তৈরির সক্ষমতা তাদের ২০২৩ সাল থেকেই ছিল।

লোহিত সাগরের উপকূলের উত্তরাংশে, যার মধ্যে হোদেইদা বন্দরনগরীও রয়েছে, হুথিদের নিয়ন্ত্রণের কারণে গোষ্ঠীটি বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোও তাদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। এই নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ক্ষতি করেছে।

হরমুজ প্রণালীর মতো বাব আল-মানদেবও এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত করার একটি অস্ত্র হিসেবে পরিণত হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল হুথিদের বিরুদ্ধে বোমা হামলা চালিয়েছে। হুথি কর্মকর্তারাও তাদের সক্ষমতার ওপর জোর দিয়েছেন। গোষ্ঠীটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা আবদুল কাদের আল-মুরতাদা গত সপ্তাহের শুরুতে বলেছেন, বাব আল-মানদেব নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন হুথিদের নেই, কারণ সৌদি জাহাজের ওপর অবরোধ এরই মধ্যে কার্যকর রয়েছে।

আল-মুরতাদা আরও উল্লেখ করেছেন যে, হুথিদের সর্বশেষ অগ্রগতির আগেই জুলাই থেকে তাদের হামলার কারণে সৌদি জাহাজগুলো বাব আল-মানদেব এড়িয়ে চলছিল। এই আকস্মিক অগ্রযাত্রায় হুথিদের পক্ষে নৌপথে চলাচল ব্যাহত করা আরও সহজ হয়েছে। এখন তাদের লোহিত সাগরের সংকীর্ণ প্রবেশপথ এবং এর কয়েকটি দ্বীপে প্রবেশাধিকার রয়েছে।

এর ফলে তারা কম পাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে এবং যেসব জাহাজে হামলা ও সেগুলোতে ওঠার লক্ষ্য রয়েছে, সেগুলোর কাছে আরও সহজে পৌঁছাতে পারবে। পাশাপাশি নৌপথ আরও সীমিত করতে সমুদ্রের নিচে মাইন ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে। এই সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রভাব বাজারের মনোভাবের ওপর পড়ছে। ব্যবসায়ীরা দক্ষিণ আরব উপদ্বীপের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ হরমুজ ও বাব আল-মানদেবে ইরান ও তার মিত্রদের নৌপথে চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতাকে আমলে নিচ্ছেন, যার ফলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে।

তবে এই অগ্রযাত্রার প্রভাব শুধু হুথিদের নৌযানে হামলার সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে আরও স্পষ্ট হচ্ছে যে, লোহিত সাগরে হুথিদের সমস্যা সহজে দূর হচ্ছে না। চলতি বছরের শুরুতে সৌদি আরব দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ইয়েমেন সরকারের অভিযানে সমর্থন দেয়। এর পর কয়েক মাস ধরে দেশটির হুথিবিরোধী শিবিরে পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।

ধারণা করা হয়েছিল, প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন সরকার অবশেষে নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি বারবার একটি ঐক্যবদ্ধ সামরিক কমান্ড কাঠামোর কথা বলেছেন। এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনী বিভাজন কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আশা করা হয়েছিল। এই বিভাজনকেই হুথিদের পরাজিত করতে না পারার কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছিল।

লোহিত সাগরের উপকূল দখলের মধ্য দিয়ে এসব ধারণাই ভেঙে পড়েছে। ইয়েমেন সরকার হুথিদের প্রতিরোধে কিছু গতি অর্জন করেছে বলে মনে হচ্ছিল, বিশেষ করে গত সপ্তাহের শুরুতেও রাজধানী সানা থেকে পূর্বদিকে আল-জাওফে অগ্রগতির দাবি করার সময় যে গতি ছিল, এখন তা আর নেই। কয়েক মাস ধরে ঐক্যের বার্তা দেয়ার পর ইয়েমেনের হুথিবিরোধী শিবির আবারও নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে এবং পরাজয়ের জন্য একে অপরকে দায়ী করছে।

সৌদি আরবের প্রতি হুথিদের বার্তা পরিষ্কার: ইয়েমেনে তোমাদের অংশীদাররা আমাদের পরাজিত করতে পারবে না। তাই হুথিদের সম্ভাব্য অবস্থান হতে পারে, সৌদি আরবকে তাদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে যেতে হবে এবং তাদের শর্ত মেনে নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের অর্থায়নে বেতন, ইয়েমেনের জ্বালানি তেল ও গ্যাস থেকে আয় পাওয়ার সুযোগ এবং হুথি-নিয়ন্ত্রিত বন্দর।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...