জাতীয়

ইয়েমেনের মোখা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিল হুথিরা, বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ

ইয়েমেনের মোখা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিল হুথিরা, বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ
ইয়েমেনের মোখা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিল হুথিরা, বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ
ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুথি বাহিনী। তীব্র লড়াইয়ের পর গতকাল শহরটির দখল নেয় তারা, যার ফলে শত শত নারী ও শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

ইয়েমেনের বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুথি বাহিনী। ইরানপন্থী এই গোষ্ঠীটি ও সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের পর গতকাল এক বড় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে শহরটির দখল নেয়। ভূরাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার অনেক আগে মোখা ছিল আরব উপদ্বীপের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং বিশ্বব্যাপী কফি বাণিজ্যের জন্মস্থান।

মোখার দখল নেওয়ার জেরে শত শত নারী ও শিশু শহরটি ছেড়ে পালিয়েছে। তারা সৌদি-সমর্থিত সরকার নিয়ন্ত্রিত লাহিজ ও এডেন প্রদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাইজ ও আল-হুদায়দা প্রদেশে আগে থেকেই ভয়াবহ মানবিক সংকট চলছিল, যা সহিংসতা বাড়ার কারণে আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে সংঘর্ষের কারণে এই এলাকাগুলোতে ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সরকারপন্থী বাহিনীর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা মোখার পতনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে হুথিরা তিনটি পৃথক দিক দিয়ে চাপ সৃষ্টি করে, যার মধ্যে ছিল পশ্চিম তাইজ, দক্ষিণ হুদায়দা এবং মোখা শহরের দিক। এই সময়ে মোখার উপকণ্ঠে তীব্র লড়াই সংঘটিত হয়।

ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের লড়াই থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হুথিদের শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সহায়তা করেছে। সৌদি-সমর্থিত জোটের অংশ ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক সালেহ, যিনি ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা।

গতকাল ভোরে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস মোখা থেকে সরে যায়, যার পর হুথিরা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। বাহিনীটি কেন সরে গেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন, কোনো সামরিক কারণ অথবা তীব্র সামরিক চাপ মোকাবেলা করতে না পারা—এর যেকোনো একটি কারণ হতে পারে। তারেক সালেহ বাহিনীকে ‘কৌশলগতভাবে পিছু হটে অবস্থান পুনর্বিন্যাসের’ নির্দেশ দেন।

এই নির্দেশের ফলে আল-ওয়াজিয়াহ ও মাওজা ফ্রন্টে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তিনি বাহিনীকে একটি বিকল্প কমান্ড সেন্টার প্রতিষ্ঠারও নির্দেশ দেন।

সংঘাত দ্রুত সমুদ্র এবং ইয়েমেনের দূরবর্তী স্থলাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। চারটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র জানিয়েছে, হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের হানিশ দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালাচ্ছে। একই সময়ে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের সামরিক শাখা জানিয়েছে, সরকারপন্থী বাহিনীর বিমান আল-তুহায়তা, আল-সালিফ এবং হুদায়দা প্রদেশের কামারান দ্বীপে হুথিদের অবস্থানে হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জুকার দ্বীপের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। দেশটির অভ্যন্তরেও সংঘর্ষ বেড়েছে। মারিবের ফারদাত নিহম এলাকায় সানা থেকে আসা হুথিদের শক্তিবৃদ্ধির ওপর যুদ্ধবিমান হামলা চালানো হয়েছে। মারিবের উত্তর ও দক্ষিণে যাওয়া হুথিদের অন্যান্য শক্তিবৃদ্ধির ওপরও হামলা হয়েছে।

মোখার ভৌগোলিক অবস্থানই শহরটির দখলকে বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ করে তুলেছে। শহরটি বাব আল-মান্দেব প্রণালি থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার (৪৭ মাইল) উত্তরে অবস্থিত। এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ‘গেট অব টিয়ার্স’ নামে পরিচিত এই সরু নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সুয়েজ খালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও জ্বালানি পরিবহনে এটি ব্যবহৃত হয়। এশীয় পণ্য ও রুশ তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও এই নৌপথটি গুরুত্বপূর্ণ। মোখার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের বাব আল-মান্দেবের ওপর ‘শ্বাসরোধী নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে পারে।

এছাড়া মোখার দখলে হুথিবিরোধী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। এর মধ্যে মোখা থেকে দক্ষিণে তাইজের সঙ্গে সংযোগকারী সড়ক এবং মোখা বন্দরের মাধ্যমে চলা সরবরাহপথও অন্তর্ভুক্ত। প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই এই ঘটনাকে যুদ্ধের একটি বাঁকবদল বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, এর ফলে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। তিনি আরও জানান, মোখা বন্দরই ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ বন্দর।

এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের এক মুখপাত্র বলেন, এই সংকটের জন্য হুথিরাই পুরোপুরি দায়ী। তিনি হুথিদের ‘অবিলম্বে হামলা ও উত্তেজনা বাড়ানোর কর্মকাণ্ড বন্ধ করার’ আহ্বান জানান।

প্রাচীন হিমইয়ারি লেখায় ‘মাখন’ নামে শহরটির উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় ৫১৭ সালে ইথিওপীয়রা প্রথম শহরটি দখল করে নেয়। ‘মোখা কফি’ নামটিও এই শহরের নাম থেকে এসেছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...