চাকরিজাল সনদে ১৫ বছর শিক্ষকতা, ধরা পড়ার পরও বহাল: প্রশ্নের মুখে নিয়োগ নীতিমালার প্রয়োগ
জাল সনদে ১৫ বছর শিক্ষকতা, ধরা পড়ার পরও বহাল: প্রশ্নের মুখে নিয়োগ নীতিমালার প্রয়োগ
জাল সনদে চাকরি ১৫ বছর, ধরা পড়ার পরও বহাল
শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ ইসলাম
আইসিটি এন্ড ক্যারিয়ার
ঝিনাইদহ জেলা সংবাদদাতা
৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০১ এএম
| আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০১ এএম
গুলশান আরা খাতুন নামে এক শিক্ষক জাল এনটিআরসিএ সনদে চাকরী করছেন ১৫ বছর। ২০০৬ সালে মন্ত্রণালয়ের অডিটে ধরা পড়ার পরও তিনি রাজনৈতিক প
ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু উপজেলার ঘোড়াগাছা লাল মোহাম্মদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোছাঃ গুলশান আরা খাতুন নামের এক শিক্ষিকা প্রায় ১৫ বছর ধরে জাল এনটিআরসিএ সনদে চাকরি করছেন, এবং এই জালিয়াতি ধরা পড়ার পরও তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন। ২০০৬ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক নিরীক্ষায় তার সনদ জাল প্রমাণিত হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি চাকরিতে টিকে ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে তিনি একটি বৈধ সনদ অর্জন করলেও, নতুন করে কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া ছাড়াই পূর্বের জাল সনদের ইনডেক্স ব্যবহার করে কীভাবে তিনি চাকরি চালিয়ে যাচ্ছেন, তা নিয়ে এক গভীর ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১১ সালের ১৯ জুন একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পর সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে গুলশান আরা খাতুন আবেদন করেন। একই বছরের ২০ জুলাই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ২০১২ সালের ১ নভেম্বর তিনি এমপিওভুক্ত হন, যার ইনডেক্স নম্বর ছিল ১০৬৯৬২১। পরবর্তীতে তৎকালীন জেলা শিক্ষা অফিসার এস. এম ছায়েদুর রহমান তার কাগজপত্র যাচাই করার সময় দেখতে পান যে, ২০০৬ সালের এনটিআরসিএ সনদটি (রোল: ১২০৪০৫৯০) জাল ছিল।
জাল সনদ প্রমাণিত হওয়ার পর তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তে বাধ্য হয়ে গুলশান আরা তার দোষ স্বীকার করেন এবং ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে উত্তোলিত ৩২ হাজার ১৪০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেন। নিয়ম অনুযায়ী, জাল সনদে চাকরি করার অপরাধে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করে ফৌজদারি মামলা দায়ের করার কথা থাকলেও, রহস্যজনক কারণে তৎকালীন সভাপতি আক্তারুজ্জামান ও প্রধান শিক্ষক নজির উদ্দিন তাকে ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর একটি ‘অস্থায়ী নিয়োগ’ দিয়ে রেখে দেন। এই পদক্ষেপ আইন ও প্রচলিত নিয়োগ নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল।
এরপর গুলশান আরা খাতুন ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর একটি বৈধ এনটিআরসিএ সনদ অর্জন করেন। কিন্তু এরপরও কোনো নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই, তৎকালীন স্কুল এবং আওয়ামী লীগের হরিণাকুন্ডু উপজেলা সভাপতি মশিউর রহমান জোয়ার্দ্দার প্রধান শিক্ষক আবুল কাসেমের সহায়তায়, ২০১৬ সালের ১ জুলাই তাকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ২০১১ সালের সেই জাল সনদের ইনডেক্সই ব্যবহার করা হয়, যা শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষিকা গুলশান আরা খাতুন অভিযোগ স্বীকার করে বলেছেন, “প্রথম নিয়োগের সময় দাখিলকৃত ২০০৬ সালের সনদটি জাল ছিল। তবে ২০১৩ সালে বৈধ সনদ অর্জনের পর ২০১৬ সালে ম্যানেজিং কমিটি রেজুলেশনের মাধ্যমে আমার চাকরি স্থায়ী করেছে।” তার এই বক্তব্য ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে।
ঘটনাটি নিয়ে হরিণাকুন্ডু উপজেলা শিক্ষা অফিসার আব্দুল বারী জানান, বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং এই কমিটি হরিণাকুন্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জাল সনদ ধরা পড়ার পর ওই শিক্ষিকাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা উচিত ছিল, কিন্তু তা না করে ম্যানেজিং কমিটি চরম ভুল ও অন্যায় করেছে। হরিণাকুন্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রদীপ্ত রায় দীপন বলেছেন, অনিয়মের প্রমাণ পেলে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। ঝিনাইদহ জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ লুৎফর রহমানও জানিয়েছেন, “ঘটনাটি ১৫ বছর আগের হলেও তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘটনাটি বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। একজন শিক্ষক জাল সনদে বছরের পর বছর চাকরি চালিয়ে যাওয়া এবং ধরা পড়ার পরও রাজনৈতিক প্রভাবে বহাল থাকা, পরবর্তীতে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই পুরনো ইনডেক্স ব্যবহার করে স্থায়ী হওয়া, পুরো ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সরকারি কোষাগারে অর্থ ফেরত দিলেও ফৌজদারি মামলা বা বরখাস্তের মতো কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়াটা এক ধরনের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে এমন অনিয়মকে আরও উৎসাহিত করতে পারে।
এই ধরনের ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও শিক্ষকদের প্রতি জনসাধারণের বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন জাল সনদধারী একজন শিক্ষক বহাল তবিয়তে চাকরি করে যান, তখন যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা বঞ্চিত হন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে এই ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি কঠোর বার্তা স্থাপন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ এই ধরনের অনিয়ম রোধে অত্যন্ত জরুরি।
জাল সনদে চাকরি, বিশেষ করে শিক্ষকতা পেশায়, একটি গুরুতর অপরাধ যা শুধু ব্যক্তিকেই নয়, পুরো সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বিদ্যমান দুর্বল যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহিতার অভাবের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। এর মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাবশালীদের পছন্দের ব্যক্তিদের সুযোগ করে দেওয়ার প্রবণতা প্রকাশ পায়, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার গুণগত মানকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এই ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমতে পারে এবং মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা নিরুৎসাহিত হবেন।
মতামত (0)