স্বাস্থ্য

মানসিক চাপ থেকে ব্রণ: প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়

মানসিক চাপ থেকে ব্রণ: প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়
মানসিক চাপ থেকে ব্রণ: প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়
মানসিক চাপ সরাসরি ব্রণ তৈরি না করলেও এর তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। সঠিক পরিচর্যা ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

পরীক্ষা, কর্মক্ষেত্রের চাপ বা পারিবারিক দুশ্চিন্তার মতো তীব্র মানসিক অস্থিরতার দিনগুলোতে মুখে ব্রণের উপদ্রব বাড়তে পারে। মানসিক প্রতিক্রিয়ার কারণে ত্বকে হঠাৎ ফুটে ওঠা এই ফুসকুড়িগুলোকে ‘স্ট্রেস অ্যাকনি’ বা ‘স্ট্রেস পিম্পল’ বলা হয়। মানসিক চাপ সরাসরি ব্রণ তৈরি না করলেও বিদ্যমান সমস্যার তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে।

সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির মুখমণ্ডলে লালচে, ফোলা ও পুঁজযুক্ত ছোট ছোট দানা বা ফুসকুড়ি দেখা যায়। এই দানাগুলো কখনও কখনও কালচে দাগ বা ক্ষতের সৃষ্টি করে। অনেকেই মনে করেন, দামি ফেইসওয়াশ বা কসমেটিকস ব্যবহার করে এই হরমোনাল ব্রণ রাতারাতি দূর করা সম্ভব।

তবে এটি ভুল ধারণা; মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল বাহ্যিকভাবে যত্ন নিলে ত্বকের সংবেদনশীল স্তরটি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নিউ ইয়র্কের আইকাহন স্কুল অফ মেডিসিনের চর্মরোগ বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অ্যাঞ্জেলা ল্যাম্ব বলেন, “রক্তে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা এবং মৃদু ক্লিনজারের সঠিক সমন্বয়ে এই ছদ্মবেশী ব্রণ দমন করা যায়।”

লস অ্যাঞ্জেলেসের সিডার্স-সিনাই মেডিকেল সেন্টারের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালিসন কে. ট্রুং একই প্রসঙ্গে বলেন, “মানসিক চাপ সরাসরি ব্রণের জন্ম না দিলেও, আগের সাধারণ ব্রণকে হঠাৎ ‘ট্রিপল স্পাইক’ হিসেবে বাড়িয়ে দিতে পারে।” ক্লিনিক্যাল সমীক্ষায় দেখা গেছে, তীব্র মানসিক চাপের মুখে মস্তিষ্কের সংকেতে শরীর থেকে ‘কর্টিসল’ নামক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন এবং ‘অ্যান্ড্রোজেন’ নামক যৌন হরমোনের ক্ষরণ অনবরত বাড়তে থাকে। এই হরমোনগুলো ত্বকের নিচের তেলগ্রন্থি ও লোমকূপের গোড়াকে অতিরিক্ত মাত্রায় উদ্দীপিত করে।

ফলে ত্বকে অতিরিক্ত সেবাম বা তেল উৎপাদিত হয়ে মৃত কোষের সঙ্গে মিশে ব্যাকটেরিয়ার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে। এটি ‘স্ট্রেস পিম্পল’ হিসেবে ত্বকের উপরিভাগে প্রকাশ পায়। ডা. অ্যাঞ্জেলা ল্যাম্ব স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মুখে হঠাৎ ওঠা যেকোনো ফুসকুড়িই যে ‘স্ট্রেস ব্রণ’ হবে, তা ভাবা ঠিক নয়।

নিশ্চিত কোনো রোগ নির্ণয়ের আগে তিনটি ভিন্ন সম্ভাবনার কথা মাথায় রাখা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে ফলিকুলাইটিস, যা লোমকূপের গোড়ায় ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের আক্রমণের ফলে তৈরি হওয়া এক ধরনের সূক্ষ্ম সংক্রমণ এবং দেখতে ব্রণের মতোই। আরেকটি সম্ভাবনা হলো অ্যালার্জিক কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস, যা কোনো নতুন কসমেটিকস, সাবান বা কেমিক্যালের অতি-প্রতিক্রিয়া থেকে ত্বকে হঠাৎ চুলকানিযুক্ত লালচে র‌্যাশের সৃষ্টিকে বোঝায়।

তৃতীয়ত, রোসাসিয়া হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগ যেখানে গাল ও নাক প্রাকৃতিকভাবেই অতিরিক্ত লালচে হয়ে যায় এবং ব্রণের মতো ছোট ছোট কালচে ক্ষত বা ‘সোয়ার্স’ দেখা যায়। মানসিক চাপ থেকে হওয়া ব্রণ দূর করতে ত্বকের তীব্রতা ও ধরন অনুযায়ী চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা তিনটি চিকিৎসা পন্থার কথা উল্লেখ করেন। হালকা ও মৃদু ব্রণের ক্ষেত্রে বেনজাইল পারক্সাইড, গ্লাইকোলিক অ্যাসিড বা স্যালিসিলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ ফেইসওয়াশ ব্যবহার করলে ত্বকের তৈলাক্তভাব দ্রুত শুষে নেয়। সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য স্যালিসিলিক অ্যাসিডের মৃদু ফর্মুলেশন দিনে সর্বোচ্চ দুবার ব্যবহার করতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

মাঝারি ব্রণের প্রদাহ ও লালচেভাব ভালো করতে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী অ্যাজেলাইক অ্যাসিড, ড্যাপসোন বা ক্লিন্ডামাইসিন সমৃদ্ধ জেল ত্বকে মাখা যেতে পারে। বন্ধ লোমকূপ পরিষ্কারে এবং কোষের পুনর্নবীকরণ সচল রাখতে রাতে ঘুমানোর আগে ০.১ শতাংশ অ্যাডাপালিন জেল বা ট্র্যাটিনয়েন ক্রিম ব্যবহার করা যায়। তবে এক্ষেত্রেও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ডা. অ্যাঞ্জেলা ল্যাম্ব বলেন, “আপনি যতক্ষণ না প্রধান কারণ অর্থাৎ ভেতরের মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন, ততক্ষণ কোনো দামি ক্রিমই স্থায়ী কাজ করবে না।” এজন্য প্রতিদিন ১০ মিনিট গভীর শ্বাসের ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মেডিটেশন বা ধ্যান এবং ডেস্কে একটানা বসে থাকার অলসতা ভেঙে অন্তত ১৫ মিনিট প্রকৃতির মাঝে হাঁটার অভ্যাস তৈরি করলে কর্টিসল হরমোন কমাতে ভূমিকা রাখে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...