ভিডিও

মোবাইল ভিডিওতে ইরানের হামলার ছক, মার্কিন সেনাদের ফোন জব্দ হওয়ার আশঙ্কা: সেন্টকম প্রধানের সতর্কবার্তা

মোবাইল ভিডিওতে ইরানের হামলার ছক, মার্কিন সেনাদের ফোন জব্দ হওয়ার আশঙ্কা: সেন্টকম প্রধানের সতর্কবার্তা
মোবাইল ভিডিওতে ইরানের হামলার ছক, মার্কিন সেনাদের ফোন জব্দ হওয়ার আশঙ্কা: সেন্টকম প্রধানের সতর্কবার্তা
সেনাসদস্যের প্রতি অপারেশনাল নিরাপত্তার বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান পেন্টাগনের। | প্রথম আলো মার্কিন সেনাদের মোবাইলের ভিডিও দেখে হামলার ছক কষে ইরান, জব্দ হতে পারে তাঁদের ফোন প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪: ০০ সাক্ষ্য দিচ্ছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। যুক্

মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডার। তিনি সতর্ক করেছেন যে, এসব ভিডিও ইরানকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার নিশানা নির্ধারণে সরাসরি সহায়তা করছে, যা যুদ্ধের কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই পরিস্থিতিতে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, ওই অঞ্চলে অবস্থানরত কিছু মার্কিন সেনাকে শিগগিরই তাঁদের মোবাইল ফোন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে, যা হাজার হাজার সেনার জন্য এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দেবে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ২৮ জুলাই, ২০২৬ তারিখে লেখা একটি চিঠিতে এই ঝুঁকির কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন, যদিও চিঠিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে এর একটি অনুলিপি এসেছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সংবাদ প্রতিবেদন বা সাংবাদিকদের অনলাইন পোস্টে সেনাসদস্যদের মোবাইল ফোনে ধারণ করা ‘প্রতিক্রিয়া, ছবি ও ভিডিও’ দেখে ইরান প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে (রিয়েল–টাইমে) নিজেদের হামলা কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে, তা বুঝতে পারছে। এই ধরনের ওপেন-সোর্স তথ্য প্রকাশের কারণে মার্কিন সেনা এবং হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে অ্যাডমিরাল কুপার জোর দিয়েছেন।

অ্যাডমিরাল কুপার তাঁর চিঠিতে সেনাদের প্রতি ‘অপারেশনাল নিরাপত্তার বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগী’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যদিও এর জন্য সুনির্দিষ্ট কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, তা তিনি বিশদভাবে উল্লেখ করেননি। ১৪ মে, ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল হিলে সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময়ও তিনি একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এই সতর্কবার্তা যুদ্ধের সংবাদ পরিবেশন নিয়ে একটি নতুন টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে মার্কিন সামরিক বাহিনী স্যাটেলাইট চিত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং অনলাইনে প্রকাশিত তথ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে, কারণ তাদের আশঙ্কা যে এসব তথ্য ইরানের কাজে লাগতে পারে।

এই প্রসঙ্গে, একটি সাম্প্রতিক ঘটনার উদাহরণ টেনে কুপার বলেছেন যে, এক সেনাসদস্যের মেটা স্মার্ট গ্লাসে ধারণ করা একটি ভিডিও ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা হয়েছিল। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় তিনি কোথায় ও কীভাবে একটি বাংকারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কুপার যুক্তি দিয়েছেন যে, এ ধরনের তথ্য প্রকাশ না হলে নিজেদের হামলা কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে, তা নির্ধারণ করা ইরানের জন্য সাধারণভাবে কঠিন হতো, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনী ইলেকট্রনিক জ্যামিংসহ শত্রুর যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত করার বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে থাকে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, জর্ডানে থাকা কিছু মার্কিন সেনাকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মোবাইল ফোন জমা দিতে বলা হয়েছে। জর্ডান এমন একটি দেশ, যা ঘন ঘন ইরানের হামলার শিকার। তৃতীয় আরেকটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, অপারেশনাল নিরাপত্তার কারণে জর্ডানের মতো পুরো অঞ্চলে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে মোবাইল ফোন জব্দের সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স এই বিষয়ে মন্তব্য করে বলেছেন, "বার্তাটি আমাদের সেনাসদস্যদের অপারেশনাল নিরাপত্তা বজায় রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে জানাতে দেওয়া হয়েছে। অপারেশনাল অগ্রাধিকার তুলে ধরতে অ্যাডমিরাল কুপার বিভিন্ন সময় এ ধরনের বার্তা দিয়েছেন।"

চলতি মাসে অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ১৭ জুলাই, ২০২৬ তারিখে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের প্রাণঘাতী হামলার সময় মার্কিন সেনারা আশ্রয়ের জন্য দৌড়ে যাচ্ছেন। এই ভিডিওটি এক মার্কিন সেনাসদস্য মেটার ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট চশমা দিয়ে ধারণ করেছিলেন। কুপার তাঁর চিঠিতে এই ভিডিওর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন যে, ইরান জানে তারা অস্ত্র ছুড়েছে, কিন্তু সেগুলো লক্ষ্যবস্তু থেকে ৫০ মিটার দূরে পড়েছে, নাকি খালি রানওয়েতে আঘাত করেছে বা জনাকীর্ণ কোনো স্থাপনায় লেগেছে—তা তারা জানে না। তাঁর ভাষায়, যখন সংবাদমাধ্যমে কোন কোন স্থাপনায় আঘাত লেগেছে তার বিস্তারিত তালিকা, বর্ণনা ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়, তখন মূলত ইরানের হয়ে বিনা মূল্যে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের কাজ করে দেওয়া হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এত বেশি হতাহতের ঘটনা মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, এবং বর্তমানে প্রতি তিনজন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র একজন এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। এই পরিস্থিতিতে, মোবাইল ফোন জব্দের মতো কড়াকড়ি আরোপ করা হলে তা ওই অঞ্চলে অবস্থানরত হাজার হাজার মার্কিন সেনার জন্য এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে, কারণ তাঁদের অনেকে ফোনে নিয়মিতভাবে স্বজনদের বার্তা পাঠিয়ে নিজেদের অবস্থার কথা জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা যুদ্ধ–সম্পর্কিত আরও তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা রাডার টাওয়ার, ব্যারাক, বিমান হ্যাঙ্গারসহ বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছেন। এছাড়াও, যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানে মেয়েশিশুদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলার বিষয়ে দেশটির সামরিক বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। এই তথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আধুনিক তথ্যযুদ্ধের এক জটিল দিক তুলে ধরে, যেখানে ব্যক্তিগত ডিভাইসগুলিও কৌশলগত দুর্বলতার কারণ হতে পারে।

সেনাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর এমন কড়াকড়ি আরোপের বিষয়টি আধুনিক যুদ্ধের এক নতুন চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে যেমন সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি, তেমনি অন্যদিকে সেনাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল যুগে যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য নিয়ন্ত্রণ কতটা জটিল এবং একটি ছোট ভিডিও ক্লিপও শত্রুর হাতে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, এই পরিস্থিতি সামরিক কৌশল প্রণয়নকারীদের জন্য একটি শিক্ষামূলক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল সামরিক ঘাঁটির সুরক্ষার প্রশ্ন নয়, বরং তথ্য প্রযুক্তির যুগে কীভাবে প্রতিটি ব্যক্তি এবং তার ব্যক্তিগত ডিভাইস একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। ভবিষ্যতে, সামরিক বাহিনীগুলোকে সম্ভবত আরও কঠোর এবং উদ্ভাবনী নিরাপত্তা প্রোটোকল তৈরি করতে হবে, যা একদিকে যেমন তথ্য ফাঁস রোধ করবে, অন্যদিকে সেনাদের মনোবল ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকবে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...