অর্থনীতিমৌলভীবাজারের স্টার অ্যাগ্রো: মসলা গুঁড়া উৎপাদনে বিশ্বমানের পথে
মৌলভীবাজারের স্টার অ্যাগ্রো: মসলা গুঁড়া উৎপাদনে বিশ্বমানের পথে
মৌলভীবাজারের স্টার অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ আদা, রসুন ও পেঁয়াজের গুঁড়া উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের সাথে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বখ্যাত আজিনোমোটোর সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
মৌলভীবাজারের মনু নদের তীরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী পশ্চিম বাজার এলাকায় স্টার অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানায় আদা, রসুন ও পেঁয়াজের গুঁড়া উৎপাদিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ব্যাংকিং খাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়ন নিয়ে কাজ করার পর সৈয়দ আমিনুল কবির ২০২০ সালে কৃষিশিল্পে সরাসরি যুক্ত হন। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের সঠিক মূল্য সংযোজন এবং প্রান্তিক কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। দেশীয় কৃষির সঙ্গে আধুনিক শিল্পের সংযোগ এবং কৃষিপণ্যের মানোন্নয়নই তার মূল উদ্দেশ্য।
দেশের মানুষ সাধারণত রান্নাবান্নায় কাঁচা বা বাটা মসলা ব্যবহার করে থাকেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে মানসম্মত কাঁচামালের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে। বড় খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্যের স্বাদ, সুগন্ধ ও মান সব সময় একই রাখা জরুরি। এই মান বজায় রাখতে নির্দিষ্ট চাহিদার বিবরণমতো গুঁড়া বা পাউডার মসলা অপরিহার্য। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্টার অ্যাগ্রো আদা, রসুন ও পেঁয়াজের গুঁড়া উৎপাদন শুরু করে। এই গুঁড়া মসলা মাংসের মসলা, বিরিয়ানি মসলা, চানাচুর, চিপসসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের শেষের দিকে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। আদা, রসুন ও পেঁয়াজের মতো কৃষিভিত্তিক কাঁচামাল বাতাসের আর্দ্রতা দ্রুত শোষণ করে নেয়, যা সঠিকভাবে শুকানো, আর্দ্রতা বজায় রাখা, পেষাই এবং সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ করে তোলে। ধীরে ধীরে নিজস্ব প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উন্নত করে তারা ক্রেতাদের চাহিদামতো নির্দিষ্ট মানের পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে।
স্টার অ্যাগ্রোর উৎপাদন ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী ভিত্তি হলো প্রান্তিক কৃষকেরা। প্রতিষ্ঠানটি ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’ বা চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের মাধ্যমে সরাসরি স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছে। স্থানীয় পর্যায়ে আদা ও রসুনের চাষ এবং ব্যবহার বাড়ানো তাদের মূল লক্ষ্য। কৃষকদের প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী করে ফসল ফলানো এবং সংগ্রহের কৌশল শেখানো হচ্ছে। এর ফলে কাঁচামালটি কোন কৃষকের জমি থেকে এসেছে, তা সহজেই নিশ্চিত হওয়া যায়, যা ‘ট্রেসিবিলিটি’ নামে পরিচিত।
তবে সব কাঁচামাল দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় না। প্রক্রিয়াজাত খাবারের নির্দিষ্ট ফ্লেভার ঠিক রাখতে সাদা পেঁয়াজ প্রয়োজন হয়, যা বাংলাদেশে চাষ হয় না। তাই এই কাঁচামাল ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। এ ছাড়া ভোজ্যতেল ও প্রসাধনপণ্যের জন্য ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ভালো মানের নারকেলের কোপরা আমদানি করে তারা ভার্জিন কোকোনাট অয়েল ও আরবিডি কোকোনাট অয়েল প্রস্তুত করছে।
পণ্যের গুণগত মানে কোনো আপস না করায় স্টার অ্যাগ্রো দেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী এবং এফএমসিজি ব্র্যান্ডগুলোর কাছে একটি নির্ভরযোগ্য নাম হয়ে উঠেছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের মাইক্রোবায়োলজিক্যাল মান, আর্দ্রতা, প্যাকেজিং ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে ভীষণ কড়াকড়ি বজায় রাখে। স্টার অ্যাগ্রো প্রতিটি ব্যাচে সমান গুণমান বজায় রেখে বিটুবি সরবরাহে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে।
প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আমিনুল কবির জানান, করপোরেট ক্রেতাদের ব্যবসায়িক গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক তথ্য প্রকাশ করেন না। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বখ্যাত জাপানি বহুজাতিক খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আজিনোমোটোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের আলোচনা এবং কারিগরি প্রস্তুতি এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠানের ফুডসেফটি, ট্রেসিবিলিটি ও ডকুমেন্টেশন–সংক্রান্ত কঠোর মানদণ্ড পূরণ করার মাধ্যমে স্টার অ্যাগ্রোর উৎপাদনব্যবস্থা পুরোপুরি বিশ্বমানের হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনার আলো ছড়ালেও স্থানীয় পর্যায়ে অবকাঠামোগত নানা সংকটে ভুগছে প্রতিষ্ঠানটি। মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীর জরাজীর্ণ সড়কব্যবস্থার কারণে বিদেশি ক্রেতারা কারখানা দেখে সন্তুষ্ট হলেও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য রপ্তানি আদেশ দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এতে দেশ প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ হারাচ্ছে। শিল্পনগরীতে গ্যাসের সংযোগ না থাকায় অতিরিক্ত খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা জ্বালানি খরচ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। বিদ্যুতের ঘন ঘন বিভ্রাট উৎপাদন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে বিদ্যুতের এই সংকট কাটাতে নিজস্ব উদ্যোগে কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে নিজেদের বিদ্যুতের বড় একটি অংশ নিজেরাই উৎপাদন করে কারখানা সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এবং লাইসেন্স নবায়নে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করছে।
আইএসও ২২০০০:২০১৮ এবং হালাল সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে স্টার অ্যাগ্রো। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের মূল লক্ষ্য হলো, দেশীয় কৃষকের উৎপাদিত আদা ও রসুনকে কেবল কাঁচা বিক্রি না করে দেশেই প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চ মূল্য সংযোজিত গুঁড়া মসলায় রূপান্তর করা। এর ফলে একদিকে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে। অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য তৈরি হবে স্থায়ী ও নিশ্চিত বিক্রয়কেন্দ্র। স্টার অ্যাগ্রো সব ধরনের প্রতিকূলতা সামলে দেশীয় কৃষিপণ্যকে বিশ্বের শিল্পচাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
মতামত (0)