আন্তর্জাতিকনেপালে বন্যা ও ধসে ৩৮৯ মরদেহ উদ্ধার, হাজারের বেশি নিখোঁজ
নেপালে বন্যা ও ধসে ৩৮৯ মরদেহ উদ্ধার, হাজারের বেশি নিখোঁজ
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক ঢলে ৩৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারের বেশি মানুষ। হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট কাদা ও ধ্বংসস্তূপে বহু এলাকা চাপা পড়েছে।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক ঢলে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। হিমবাহ ধসের পর প্রবল স্রোতে ভেসে আসা কাদা ও ধ্বংসস্তূপে বিস্তীর্ণ এলাকা চাপা পড়েছে। উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই মরদেহের সংখ্যা বাড়ছে।
২৮ আগস্ট শুক্রবার সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ছিল ৩৫৯, যা অল্প সময়ের ব্যবধানে আরও বেড়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল পুলিশের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানানো হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলছে।
গত ২৬ আগস্ট বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার দিকে হঠাৎ ভয়াবহ ঢল নেমে আসে। হিমবাহ ধসের পর চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেন্দে নদীতে বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
প্রবল স্রোত পরে ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর আশপাশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যে পানির তোড়ে ভেসে যায় বহু ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। অনেক এলাকা কাদা ও ধ্বংসস্তূপে পুরোপুরি ঢেকে গেছে।
আকাশ থেকে ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিওতে বন্যার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একসময় প্রাণচঞ্চল থাকা গ্রাম ও বাজার এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোথাও শুধু কাদার স্তূপ, কোথাও ভেঙে পড়া ঘরবাড়ি ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে।
বন্যার পর দুর্গত এলাকায় নেপালের সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিত ও নিখোঁজদের সন্ধান চালানো হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযানের সময় কাদার নিচ থেকে জীবিত অবস্থায় একজন বৃদ্ধাকে উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে। এতে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো কেউ জীবিত থাকতে পারেন এমন আশায় উদ্ধারকাজ আরও জোরদার করা হয়েছে।
তবে ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক ও সেতু, কাদার স্তূপ এবং প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থার কারণে উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা থাকায় উদ্ধারকারী দলগুলোকেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যায় শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নয়, বিদেশি পর্যটকরাও নিখোঁজ হয়েছেন। নেপালের পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতের নাগরিক।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকও নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাস ও কর্তৃপক্ষও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
ভয়াবহ বন্যার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই নতুন করে আরেকটি বড় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কাঠমান্ডুভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থার জলবায়ুঝুঁকি বিশেষজ্ঞ চিয়াংগং ঝাং সতর্ক করে বলেছেন, চীন-নেপাল সীমান্তবর্তী নদীর উজানে ধসে পড়া বিপুল পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ বিভিন্ন স্থানে আটকে রয়েছে।
এর ফলে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে নতুন জলাধার তৈরি হয়েছে। উজানে আটকে থাকা পানি ও ধ্বংসস্তূপের বাধ হঠাৎ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি একসঙ্গে ভাটির দিকে নেমে আসতে পারে। এতে নতুন করে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
নতুন বন্যার আশঙ্কা নিয়ে চীনও সতর্কবার্তা দিয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ প্রাকৃতিক বাধায় আটকে গিয়ে নেপালে একটি অস্থায়ী বা কৃত্রিম হ্রদের মতো জলাধার তৈরি হয়েছে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকালে ওই জলাধারে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছিল। আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিব্বতে উৎপত্তি হওয়া ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে এই নতুন জলাধার তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে চীন। চীনা কর্তৃপক্ষ বলছে, জলাধারটির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখা হয়েছে।
বন্যার ভয়াবহতা তিব্বতেও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। চীনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি হলো গিরং কাউন্টির সীমান্তবর্তী গিরং সীমান্ত বন্দর। গত ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চীনা উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছাতে পারেনি।
গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জমে থাকা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছিল। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীনের অংশে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
মতামত (0)