স্বাস্থ্য

পিঁপড়ের মিষ্টি খোঁজার কৌশল: অ্যান্টেনা ও রাসায়নিক সংকেতের ব্যবহার

পিঁপড়ের মিষ্টি খোঁজার কৌশল: অ্যান্টেনা ও রাসায়নিক সংকেতের ব্যবহার
পিঁপড়ের মিষ্টি খোঁজার কৌশল: অ্যান্টেনা ও রাসায়নিক সংকেতের ব্যবহার
পিঁপড়েরা তাদের অ্যান্টেনা ব্যবহার করে মিষ্টিজাতীয় খাবারের ঘ্রাণ ও রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করে। তাদের বিশেষ ঘ্রাণশক্তি রিসেপ্টর এবং এক ধরনের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা নির্ভুলভাবে খাবারের উৎস খুঁজে পায়।

চা বানানোর সময় অসাবধানতাবশত চিনির দানা পড়ে যেতে পারে। পায়েস তৈরির সময় দুধ উথলে চুলার আশেপাশে ছড়িয়ে পড়া বা মিষ্টি খাওয়ার সময় তার গুঁড়ো টেবিলের নিচে পড়া স্বাভাবিক ঘটনা। এসব ক্ষেত্রে কিছুক্ষণ পরেই পিঁপড়ের দল ঘরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেরিয়ে আসে। তারা সরাসরি সেই স্থানে উপস্থিত হয় যেখানে মিষ্টিজাতীয় কিছু পড়ে থাকে।

পিঁপড়েরা তাদের শুঁড় বা অ্যান্টেনা ব্যবহার করে ঘরের মেঝে অনুভব করতে পারে। এর মাধ্যমে তারা এমন সব ঘ্রাণ ও রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করে যা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এভাবেই তারা পড়ে থাকা খাবারের কণাও নির্ভুলভাবে খুঁজে বের করে।

বাসা থেকে বহু দূরে অবস্থান করলেও রান্নাঘরের ঘ্রাণ পিঁপড়েদের কাছে ঠিকঠাক পৌঁছায়। খাবার খোঁজার জন্য পিঁপড়েদের একটি বিশেষ প্রাচীন ব্যবস্থা রয়েছে। এটি রাসায়নিক সংকেত, স্মৃতি এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ব্যবহার করে তৈরি একটি নেটওয়ার্কের মতো কাজ করে।

২০১৬ সালে ভারতের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির গবেষক হিমেন্দর ভারতী চীন ও জাপানের গবেষকদের সঙ্গে কাজ করেন। তারা ভারতে পাওয়া যায় এমন ৮২৮টি পিঁপড়ের প্রজাতি ও উপপ্রজাতির একটি তালিকা সংকলন করেন।

২০২৪ সালে তামিলনাড়ুর তিরুভাল্লুর জেলায় পিঁপড়ের বিভিন্ন প্রজাতির ওপর একটি সমীক্ষা চালানো হয়। এই সমীক্ষায় মানুষের ঘরসহ বিভিন্ন জায়গায় বাস করে এমন ৩৪ প্রজাতির পিঁপড়ের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে রান্নাঘরে দেখা যাওয়া পিঁপড়েরা কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির নয় বলে জানানো হয়।

গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে সমস্ত প্রজাতির পিঁপড়েদের জীবনযাত্রা একই রকম। খাদ্যের সন্ধানে তাদের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিছু পিঁপড়ে ঘরের দেয়াল, ফাটল, জানালা, পাইপ এবং মেঝের কোণা ঘেঁষে চলাচল করে।

এদের মূল কাজ হলো চারপাশের পুরো এলাকা খুঁজে দেখা। তাদের শরীরে অ্যান্টেনার মতো একটি যন্ত্র রয়েছে। খাবারের সন্ধান চালানোর ক্ষেত্রে এই অ্যান্টেনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মাইক্রোবায়োলজির জগতে পিঁপড়েকে এমন এক ধরনের জীব হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যাদের জগৎ একেবারেই ভিন্ন। গবেষক শন কে ম্যাকেঞ্জির নেতৃত্বে এক গবেষণায় দেখা যায়, পিঁপড়ের জিনোমে গন্ধ-সংবেদনশীল জিনের প্রাচুর্য রয়েছে। জিনোম হলো কোনো জীবের জিনগত নির্দেশাবলীর সমষ্টি।

২০১২ সালে ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের চালানো একটি গবেষণা বিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে অন্যান্য অনেক প্রজাতির পোকা-মাকড়ের তুলনায় পিঁপড়েদের শরীরে চার থেকে পাঁচগুণ বেশি ঘ্রাণশক্তি রিসেপ্টর রয়েছে।

সহজভাবে বললে, রান্নাঘর পিঁপড়েদের কাছে শুধু একটি জায়গা নয়। এটি অগণিত রাসায়নিক সংকেতে ভরপুর এমন একটি ক্ষেত্র, যা শুধুমাত্র তারাই লক্ষ্য করতে পারে। মানুষের চোখে এসব ধরা পড়া সম্ভব নয়।

কয়েক দানা চিনি, গুড়ের কণা, দুধ, চায়ের ফোঁটা, চামচে লেগে থাকা ঘিয়ের দাগ বা রান্নাঘরের সিঙ্কের চারপাশের আর্দ্র জায়গা দিয়েই বেশিরভাগ পিঁপড়েরা খোঁজাখুঁজির কাজ শুরু করে। এই স্থানগুলো তাদের খাদ্য অনুসন্ধানের প্রাথমিক উৎস হিসেবে কাজ করে।

ডা. ওয়াকার জলিলের নেতৃত্বে ফায়ার অ্যান্টের ওপর একটি গবেষণা চালানো হয়েছিল। ২০২১ সালে একটি জার্নালে প্রকাশিত হয় এই গবেষণা। এতে পিঁপড়ের খাবারের তালিকায় মিষ্টি উপাদান, তাদের অ্যান্টেনায় থাকা স্বাদগ্রাহক এবং পিঁপড়ের সামনের পায়ের মধ্যে বিশেষ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়।

পিঁপড়েরা নিজেদের কলোনি বা গোত্রে টিকে থাকতে এবং শক্তি জোগাতে মূলত মিষ্টিযুক্ত খাবারের ওপর নির্ভর করে। উদ্ভিদের মিষ্টি রস, মধু, ফল ইত্যাদি তাদের প্রধান খাদ্য উৎস। যেহেতু এ ধরনের খাবারের ঘ্রাণ বাতাসে তীব্র নয়, তাই পিঁপড়েরা খাবারের কণার সংস্পর্শে এলে তা শনাক্ত করতে তাদের শরীরে উপস্থিত বিশেষ অ্যানাটমিকাল সিস্টেম ব্যবহার করে।

ওই গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পিঁপড়ের শরীরে উপস্থিত স্বাদগ্রাহক খাবারে সংস্পর্শে আসা মাত্র চিনির ক্ষুদ্রতম কণাকেও শনাক্ত করতে পারে। ঘরের এক কোণায় পড়ে থাকা খাবারের ক্ষুদ্র কণা, চামচ বা পাত্রে লেগে থাকা চা কিংবা মিষ্টি পানীয়ের দাগও খাদ্য অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...