বিনোদন

পঙ্কজ ত্রিপাঠির ৫০তম জন্মদিন: ট্রাক্টরের অপূর্ণ স্বপ্ন থেকে সফল অভিনেতা

পঙ্কজ ত্রিপাঠির ৫০তম জন্মদিন: ট্রাক্টরের অপূর্ণ স্বপ্ন থেকে সফল অভিনেতা
পঙ্কজ ত্রিপাঠির ৫০তম জন্মদিন: ট্রাক্টরের অপূর্ণ স্বপ্ন থেকে সফল অভিনেতা
আজ ৫০ বছরে পা দিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা পঙ্কজ ত্রিপাঠি। ট্রাক্টর কেনার অপূর্ণ স্বপ্নই তাঁকে অভিনয়ের পথে নিয়ে আসে, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

জনপ্রিয় অভিনেতা পঙ্কজ ত্রিপাঠি আজ ৫০ বছরে পা দিলেন। আজ ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন। গতকাল, ৪ সেপ্টেম্বর, প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে তাঁর আলোচিত সিনেমা ‘মির্জাপুর: দ্য মুভি’। হিন্দি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় এই অভিনেতা বড় পর্দা ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সমানভাবে সাবলীল।

‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’, ‘নিউটন’, ‘মাসান’, ‘মিমি’, ‘স্ত্রী’ ও ‘মির্জাপুর’-এর মতো ছবিতে তিনি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন। ছোট চরিত্রেও তাঁর উপস্থিতি দর্শকের মনে আলাদা করে জায়গা করে নেয়।

পঙ্কজ ত্রিপাঠির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল একটি অপূর্ণ স্বপ্ন। কৃষক পরিবারের সন্তান পঙ্কজ চেয়েছিলেন, তাঁর বাবা একদিন একটি ট্রাক্টর কিনবেন। এরপর তিনি পড়াশোনা শেষ করে সেই ট্রাক্টর দিয়ে খেতখামারের কাজ করবেন।

কিন্তু পরিবারটির ট্রাক্টর কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। ছেলের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে না পারায় পঙ্কজের খুব মন খারাপ হয়েছিল। এই না পাওয়া ট্রাক্টরই তাঁকে হিন্দি সিনেমার পথে নিয়ে যায়।

খেতখামারের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বাবা ছেলেকে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে বললেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, পঙ্কজ চিকিৎসক হবেন। নিজের উপার্জনে একদিন ট্রাক্টর কিনে অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করবেন।

বাবার কথা মেনে পঙ্কজ বিহারের গোপালগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম ছেড়ে পাটনায় পাড়ি জমান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পড়াশোনা করে চিকিৎসক হওয়া। কিন্তু পাটনায় এসে তাঁর জীবনের হিসাবই বদলে যায়।

পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ছাত্ররাজনীতি ও আন্দোলনে যুক্ত হন। একসময় তাঁর থিয়েটারের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। মঞ্চ, মহড়া ও অভিনয়ের জগৎ তাঁকে এমনভাবে টানে যে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়।

শেষ পর্যন্ত তিনি চিকিৎসক হতে পারেননি, অভিনেতা হয়েছেন। পরে এক অনুষ্ঠানে মজা করে তিনি বলেছিলেন, ‘ডক্টর’ হতে এসে তিনি ‘অ্যাক্টর’ হয়ে গেছেন।

যে ট্রাক্টর না পাওয়ায় একসময় কষ্ট পেয়েছিলেন, বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে পঙ্কজের কাছে সেটিকেই আশীর্বাদ বলে মনে হয়েছে। তাঁর উপলব্ধি, সব অপূর্ণতা শেষ পর্যন্ত ক্ষতি ডেকে আনে না। কোনো কোনো না-পাওয়া মানুষকে তার আসল গন্তব্যের দিকে ঠেলে দেয়।

বাবা যদি সেদিন ট্রাক্টরটি কিনতে পারতেন, তাহলে হয়তো পঙ্কজ গ্রামেই থেকে যেতেন। তিনি খেতখামারে মন দিতেন, পাটনায় যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। থিয়েটারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটত কি না, সেটিও অনিশ্চিত।

হিন্দি সিনেমা হয়তো পেত না ‘গ্যাংস অব ওয়াসেপুর’-এর সুলতান কুরেশি, ‘মির্জাপুর’-এর কালিন ভাইয়া কিংবা ‘স্ত্রী’র রুদ্রকে। যে ট্রাক্টরটি না পাওয়াকে একসময় ব্যর্থতা মনে হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর সামনে সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় দরজা খুলে দিয়েছিল।

পাটনায় পড়াশোনার সময়ই অভিনয়ের প্রতি পঙ্কজ ত্রিপাঠির প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়। নাটকের মহড়া ও মঞ্চে অভিনয়ের টানে তিনি স্নাতকের পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দেন। শুধু থিয়েটার করে জীবন চালানো সম্ভব ছিল না।

তাই তিনি হোটেল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দুই বছরের একটি কোর্স করেন। প্রশিক্ষণ শেষে পাটনার একটি হোটেলে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে চাকরি নেন।

চাকরির সময়সূচি তিনি থিয়েটারের মহড়ার সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করতেন। কখনো দিনের বেলা হোটেলের রান্নাঘরে কাজ করে সন্ধ্যার পর নাটকের দলে চলে যেতেন। আবার দিনে মহড়া থাকলে রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত রান্নাঘর পরিষ্কারের দায়িত্ব নিতেন।

টানা রাত কাজ করার পরও থিয়েটারে যেতে তাঁর ক্লান্তি লাগত না। তবে চাকরির চেয়ে অভিনয়েই বেশি মন পড়ে থাকায় হোটেলের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের বকুনিও শুনতে হতো। তাঁরা বলতেন, কাজে তাঁর মন নেই, এভাবে তাঁকে দিয়ে হবে না।

চাকরি ও থিয়েটার—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে প্রায় দুই বছর কাটানোর পর পঙ্কজ বুঝতে পারেন, অভিনয়কেই পেশা করতে চান। সেই লক্ষ্যে তিনি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় (এনএসডি) ভর্তির খোঁজ নেন। তখন জানতে পারেন, সেখানে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতক।

তাঁর হোটেল ব্যবস্থাপনার সনদটি স্নাতক সমমানের ছিল না। অন্যদিকে, অভিনয়ের টানে আগের পড়াশোনাও অসমাপ্ত রেখেছিলেন।

অভিনয় শেখার পথ খুলতেই পঙ্কজ আবার শিক্ষাজীবনে ফেরেন। তিন বছর সময় নিয়ে তিনি স্নাতক শেষ করেন। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেও প্রথমবার এনএসডি-তে সুযোগ পাননি।

পরের বছর তিনি আবার আবেদন করেন, সেবারও প্রত্যাখ্যাত হন। দুই দফা ব্যর্থতার পরও পঙ্কজ হাল ছাড়েননি। নিজেকে আরও প্রস্তুত করে তৃতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন এবং অবশেষে ভারতের মর্যাদাপূর্ণ এই নাট্যবিদ্যালয়ে সুযোগ পান।

ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় প্রশিক্ষণ পঙ্কজের অভিনয়ভাবনা ও প্রস্তুতির ধরন বদলে দেয়। তিনি ২০০৪ সালে সেখানে পড়াশোনা শেষ করেন। একই বছর স্ত্রী মৃদুলা ত্রিপাঠিকে সঙ্গে নিয়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান।

তাঁর সঙ্গে ছিল না চলচ্চিত্রজগতের কোনো পরিচিতি বা প্রভাবশালী কারও আশ্বাস। সম্বল ছিল থিয়েটারের অভিজ্ঞতা, অভিনয়ের প্রশিক্ষণ আর বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

একসময় পাটনার একটি হোটেলে কর্মীরা যে পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকতেন, পঙ্কজ ত্রিপাঠিও সে পথেই রান্নাঘরে কাজ করতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বহু বছর পর সেই হোটেলেই তিনি অতিথি হয়ে ফিরেছিলেন।

এবার তাঁর জন্য প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হয়েছিল। হোটেলের মহাব্যবস্থাপক তাঁকে স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুহূর্তটি অভিনেতাকে আবেগপ্রবণ করেছিল। তাঁর মনে হয়েছিল, কঠোর পরিশ্রম করলে জীবনে সত্যিই অনেক অসম্ভব সম্ভব হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...