জাতীয়

প্রকৃতির নিজস্ব বিধানে অপরাধের বিচার অনিবার্য

প্রকৃতির নিজস্ব বিধানে অপরাধের বিচার অনিবার্য
প্রকৃতির নিজস্ব বিধানে অপরাধের বিচার অনিবার্য
প্রকৃতিকে সর্বংসহা মনে হলেও এটি নির্মম প্রতিশোধ গ্রহণকারী। মানবসৃষ্ট বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলেও প্রাকৃতিক আদালতে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হয় বলে একজন সাবেক বিচারক মন্তব্য করেছেন।

এ বিশ্বচরাচরে দৃশ্য-অদৃশ্য সকল বিষয় এবং জীবন ও প্রাণ যা মানবসৃষ্ট নয়, তাই প্রকৃতি। সাধারণত, প্রকৃতি বলতে সমগ্র সৃষ্টিজগতকে বোঝানো হয়। সংবেদনশীলতা প্রকাশ না করায় প্রকৃতিকে প্রায়শই প্রাণহীন মনে করা হয়।

প্রাণহীন এই সৃষ্টিকে সর্বংসহা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, প্রকৃতিকে কোনো বিষয়ে সাধারণত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেখা যায় না। মানুষ প্রকৃতির সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী জীব। প্রকৃতিরাজ্যে মানুষ যা-ই করুক না কেন, এ বিষয়ে প্রকৃতির কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ নেই বলে ধরে নেওয়া হয়।

প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিতে অত্যন্ত সুসংবদ্ধ, ক্রিয়াশীল এবং সুশৃঙ্খল। এর চিরায়ত নিয়মে কখনো কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে এবং পশ্চিম দিকে অস্ত যায়, এই নিয়মের কোনো হেরফের হয় না। অতিপ্রাকৃতিক সকল বিষয়েও একই কথা প্রযোজ্য, যা সন্দেহ-সংশয়ের ঊর্ধ্বে।

মানুষ প্রকৃতির অধিকতর সুবিধাভোগী জীব হলেও এটি তাদের জন্য শর্তহীন বা অবারিত নয়। বরং প্রকৃতগতভাবেই তা সুসংবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই স্বেচ্ছাচারী বা সীমালঙ্ঘনকারী হওয়ার সুযোগ নেই। মানুষ যখন সৃষ্টির প্রথাগত নিয়মে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তখন এ বিশ্বচরাচর গতিশীল, শান্তিময় ও আনন্দঘন হয়ে ওঠে।

তবে এর ব্যত্যয় ঘটলে তা ছন্দ ও গতিশীলতা হারায় এবং সৃষ্টিজগতের ভারসাম্য নষ্ট হয়। সভ্যতার ইতিহাসে এই নিয়মভঙ্গকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। আইনের ভাষায়, অপরাধকে সভ্যতার অবদান হিসেবে দেখা হয়।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রকৃতি ও বিবেকবিরুদ্ধ কাজগুলোকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রাক-সভ্যতায় এমনটা ছিল না। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অপরাধের সংজ্ঞায়ন এবং তা প্রতিবিধানের জন্য আইন, সংবিধান, দণ্ডবিধি, আদালত, বিচারকসহ যাবতীয় অবকাঠামোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে গঠনগত ত্রুটি, প্রায়োগিক জটিলতা এবং নানাবিধ দুর্বলতার কারণে সভ্যতা এক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। মানুষের কোনো কাজই নির্ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। মানুষের পক্ষে ষড়রিপুর প্রভাবমুক্ত হওয়াও সম্ভব নয়। বস্তুত যা অতিপ্রাকৃতিক, তা-ই নির্ভুল।

এ কারণে মানবসৃষ্ট প্রক্রিয়ায় অপরাধের প্রতিবিধান অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয় না। অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুসারে ইহজাগতিক নিয়মে যথাযথ শাস্তিবিধানও সম্ভব নয়। এ থেকেই পারলৌকিকতার যুক্তি ও আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।

অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও অশুভ প্রবণতা মানবসভ্যতায় দুষ্টক্ষত সৃষ্টি করেছে। অপরাধ দমন ও প্রতিবিধানের জন্য আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেসব অনুষঙ্গ রয়েছে, সেগুলো নানাবিধ কারণে স্বাভাবিকভাবে কার্যসম্পাদন করতে পারে না।

প্রাণহীন ও স্থবির প্রকৃতিও সর্বংসহা বৈশিষ্ট্যের বলে মনে করা হয়। ফলে এই বসুধাবক্ষ এখন অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্য হলেও প্রকৃতি কি নীরব দর্শক বা সর্বংসহা, নাকি প্রতিশোধ গ্রহণকারী? এই প্রশ্নই এখন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসগত পার্থক্যের কারণে বিষয়টি নিয়ে একক ও অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

জয়পুরহাট জেলার এক সময়ের দায়রা জজ বাবু নরেন্দ্র কুমার দাস বিষয়টি নিয়ে অতিপ্রাণবন্ত আলোচনা করেছেন। একটি ধর্ষণ মামলার শুনানির সময় কথা প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছিলেন, তা খুবই মর্মস্পর্শী, হৃদয়গ্রাহী ও অন্তরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল।

তার বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে, প্রকৃতি নির্জীব, চলৎশক্তিহীন ও সর্বংসহা মনে হলেও আসলে তা সঠিক নয়। প্রকৃতি নির্মম প্রতিশোধ গ্রহণকারী। প্রকৃতি কারো অণুপরিমাণ অপরাধও সহ্য করে না। সময়ের প্রয়োজনে ঠিকই বিক্ষুব্ধ ও সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

অপরাধ ও অপরাধীর প্রতিবিধান হয় প্রাকৃতিক আদালতে। তবে অন্তরদৃষ্টিসম্পন্নরাই শুধু তা উপলব্ধি করতে পারেন। তিনি "আকলমান্দ কি লিয়ে ইশারা কাফি" বলে মন্তব্য করেন।

তিনি মনে করেন, আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র নানাবিধ প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার কারণেই অপরাধের প্রতিবিধান করতে পারে না। পরিবারগুলো এক্ষেত্রে খুবই অসহায়। অপরাধ দমন বা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাফল্যও আহামরি নয়।

ক্ষেত্রবিশেষে মামলা হলেও প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষীর অভাবে আদালতও অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারে না। কারণ, কেউ অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে চায় না। অনেক ক্ষেত্রে সমাজের ক্ষমতাশালী, বিত্তশালী ও প্রভাবশালীদের কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।

অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে নতুন উদ্যোমে অপরাধ চালিয়ে যায়। তারা ভাবে যে তাদের ধরার মতো শক্তি আর কারো নেই। কিন্তু অপরাধী কখনো প্রকৃতির রূঢ়তা ও নির্মম প্রতিশোধ থেকে বাঁচতে পারে না। কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতিগতভাবেই অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয়।

অপঘাত-অপমৃত্যু, যন্ত্রণাদায়ক ও দুরারোগ্য দীর্ঘ রোগভোগ, দুর্ঘটনা, পারিবারিক ও সামাজিক কলহবিবাদ, গণমানুষের রুদ্ররোষ, রাষ্ট্রাচারের বিচ্যুতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী এবং জীবন চলার পথে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে প্রকৃতির বিচার নিশ্চিত হয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...