পরিবেশরংপুরের তিস্তায় দুর্লভ উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁসের দেখা
রংপুরের তিস্তায় দুর্লভ উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁসের দেখা
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রংপুরের তিস্তা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে দুর্লভ উত্তুরেল্যাঞ্জা ও উত্তুরেখুন্তে হাঁসের দেখা মিলেছে। দেশি হাঁসের ঝাঁকের মধ্যে এই পরিযায়ী পাখিদের বিচরণ করতে দেখা যায়।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রংপুরের তিস্তা নদীসংলগ্ন একটি নিম্নাঞ্চলে দুর্লভ দুটি পরিযায়ী হাঁসের দেখা মিলেছে। পালিত হাঁসের ঝাঁকের মধ্যে উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁস এবং উত্তুরেখুন্তে হাঁস ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পাখি পর্যবেক্ষকরা দেশি হাঁসের মাঝে এই ভিন্ন প্রজাতির হাঁস দুটিকে শনাক্ত করেন।
পাখি পর্যবেক্ষণে আগ্রহী ব্যক্তিরা ছোটবেলায় মা-চাচিদের কাছ থেকে বুনো হাঁস ও পালিত হাঁসের সহাবস্থানের কথা শুনেছেন। বুনো হাঁস মাঝে মাঝে পালিত হাঁসের সাথে বাড়িতেও চলে আসতো এবং দু-এক দিন থেকে আবার চলে যেত। এই স্মৃতিগুলো সাম্প্রতিক পাখি পর্যবেক্ষণের সময় মনে পড়েছে।
শীতকালে তিস্তা নদীর কোন অংশে কোন প্রজাতির পাখি আসে তা জানতে কয়েকজন মিলে নিয়মিত অনুসন্ধান চালান। তাঁদের সাথে তিস্তায় নিয়ে যান খাইরুল ইসলাম নামের একজন মাঝি। মাঝি একদিন জানান, তিস্তা নদী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন একটি বড় কোলা বা নিম্নাঞ্চল রয়েছে, যেখানে সম্প্রতি অনেক পাখি দেখা গেছে। এই স্থানটি রংপুর জেলার অন্তর্গত।
পাখি দেখতে প্রায় দেড় কিলোমিটার চর হেঁটে সেই কোলায় যেতে হয়। সেখানে পৌঁছে দূর থেকে অসংখ্য শামুকখোল পাখি দেখা যায়। এরপর গাঙ টিটি, তিলা লালপা, পাতি সবুজপা এবং কয়েকটি নথজিরিয়া পাখি চোখে পড়ে। কিছু পাখি বিশ্রাম নিচ্ছিল, আবার কিছু খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত ছিল।
দীর্ঘ চর হেঁটে যাওয়ায় পর্যবেক্ষকদের ক্লান্তি লাগছিল। ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে তারা কোনো বিশেষ পাখি আছে কিনা তা বোঝার চেষ্টা করছিলেন। মাঝিকে কাছাকাছি গিয়ে দেশি হাঁসের ঝাঁকে থাকা একটি ভিন্ন পাখিকে দেখে আসতে বলা হয়। মাঝি ঠিকমতো চিনতে না পেরে কাছে যেতে ইশারা করেন।
দূর থেকে ক্যামেরায় দেখে পাখিটিকে উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁস হিসেবে শনাক্ত করা হয়। রংপুর অঞ্চলে তিস্তায় এই হাঁস এর আগে কখনো দেখা যায়নি; কয়েক বছর আগে কেবল কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদে একবার দেখা গিয়েছিল। এটি তিস্তায় দেখা পাখির তালিকায় নতুন সংযোজন। কাছে যেতেই উত্তুরেল্যাঞ্জা ছাড়া আরেকটি ভিন্ন হাঁস দেখা যায়, যা দেশি হাঁসের থেকে সামান্য আলাদা ছিল এবং উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁসের কাছাকাছিই ছিল।
আরও কাছে যেতে বোঝা যায়, দ্বিতীয় পাখিটি ছিল উত্তুরেখুন্তে হাঁস। এই প্রজাতির হাঁস প্রতি বছর তিস্তা এবং ব্রহ্মপুত্র নদে দেখা যায়। উত্তুরেল্যাঞ্জা এবং উত্তুরেখুন্তে উভয় জাতের হাঁসই শীতকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিযায়ী হিসেবে আসে।
এসময় এক ব্যক্তি জাল নিয়ে মাছ ধরতে এলে হাঁস দুটি দেশি হাঁসের দলের ভেতরে ঢুকে যায়। দেশি হাঁসের দলে মিশে যাওয়ায় সেগুলোকে আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না। কয়েক দিন ধরে ওই কোলায় পরিযায়ী হাঁস দুটিকে দেশি হাঁসের ঝাঁকের সাথে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁসটি ছিল পুরুষ এবং উত্তুরেখুন্তে হাঁসটি ছিল স্ত্রী। একদিন পরে একটি স্ত্রী উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁসও দেখা যায়, ফলে মোট তিনটি উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁস সেখানে উপস্থিত ছিল। এর কয়েক দিন পর রংপুরের তিস্তায় এক জোড়া উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁসের দেখা মেলে।
পরে প্রকৌশলী ফজলুল হক জানান, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ভাড়েরদহ বিলে অনেক পাখি আসতে শুরু করেছে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁসও রয়েছে। পবিত্র রমজান মাসের এক বিকেলে সেখানে গিয়ে হাজার হাজার পাতিসরালির ভিড়ে কয়েকটি উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁস দেখা যায়।
উত্তুরেল্যাঞ্জা হাঁস দেখতে অদ্ভুত মায়াবী এবং সহজে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই হাঁসের লেজের শেষ প্রান্ত সুচের মতো হয়। উড়ার সময় লেজের এই বিশেষ আকৃতির কারণে এদের সহজে চেনা যায়। এদের মাথা থেকে গলা পর্যন্ত চকলেট রঙের হয় এবং চকলেট রঙের গলায় একটি সাদা রেখা থাকে।
উত্তুরেখুন্তে স্ত্রী হাঁসটি দেখতে প্রায় দেশি হাঁসের মতোই। তবে এর ঠোঁট পালিত হাঁস থেকে আলাদা। এদের ঠোঁট অনেক চ্যাপ্টা হয়, যা এদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। শীতপ্রধান বিভিন্ন দেশ থেকে এই পরিযায়ী পাখিরা খাবার ও নিরাপদ আবাসের খোঁজে বাংলাদেশে আসে।
মতামত (0)