জাতীয়

রোহিঙ্গা সংকট: প্রত্যাবাসন ও রাখাইন পরিস্থিতি

রোহিঙ্গা সংকট: প্রত্যাবাসন ও রাখাইন পরিস্থিতি
রোহিঙ্গা সংকট: প্রত্যাবাসন ও রাখাইন পরিস্থিতি
মিয়ানমারের সামরিক দমন-পীড়নের মুখে বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইনে সংঘাত ও নাগরিকত্ব সংকটের কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জটিলতায় পড়েছে।

রোহিঙ্গারা পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি রাষ্ট্রবিহীন ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী। তারা ঐতিহাসিকভাবে আরাকানী হিসেবেও পরিচিত এবং বাংলা ভাষা বলয়ের উপভাষায় কথা বলে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, ১৯৮২ সালের আইনে রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা অর্জনের সম্ভাবনা কার্যকরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া গেলেও, মিয়ানমারের আইন এই সংখ্যালঘু নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে তাদের জাতীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। তাদের আন্দোলনের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা ১৯৭৮, ১৯৯১-১৯৯২, ২০১২, ২০১৫ এবং ২০১৬-২০১৭ সালে সামরিক নির্যাতন ও দমনের শিকার হয়েছে।

জাতিসংঘ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো দমন ও নির্যাতনকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মিয়ানমারের বিশেষ তদন্তকারী ইয়ংহি লি বিশ্বাস করেন, মিয়ানমার তাদের দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণভাবে বিতাড়িত করতে চায়। ২০০৮ সালের সংবিধান অনুসারে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এখনো সরকারের অধিকাংশ বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে, যার মধ্যে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয় অন্তর্ভুক্ত।

সেনাবাহিনীর জন্য সংসদে ২৫% আসন বরাদ্দ রয়েছে এবং তাদের মধ্য থেকে একজন উপ-রাষ্ট্রপতি থাকার বাধ্যবাধকতাও আছে। ৯ বছর আগে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এক বিশাল মানবিক সংকট দেখা দেয়। সহিংস হামলার শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসে।

তাদের গ্রামগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয় এবং এটি সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে মানুষের এক নজিরবিহীন ঢলের সূচনা করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের খোঁজে লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। স্থানীয় বাংলাদেশীদের উদার সমর্থন এবং বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে বহুজাতিক সহায়তা প্রচেষ্টার কারণে একটি মারাত্মক মানবিক সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছিল।

ইউনিসেফ এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশীদাররা পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পুষ্টি এবং সুরক্ষাসহ মৌলিক সেবাগুলো বিস্তৃত ও জোরদার করেছে। তখন থেকে তাদের প্রত্যাবাসনে তোড়জোড় শুরু হলেও সেই প্রক্রিয়া এতদিনেও আলোর মুখ দেখেনি। মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে নিজেদের আন্তরিকতা প্রমাণ করতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সময়ের সঙ্গে রাখাইনের পরিস্থিতি বদলেছে এবং সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। যুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা ও নাগরিকত্বের সংকটে ঘরে ফেরার সব পথ এখনো বন্ধ রয়েছে। তবু বাস্তুচ্যুতদের বড় একটি অংশ নিজেদের ঘর, ভূমি ও পরিচয়ে ফেরার স্বপ্ন দেখছেন।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এখন বড় বাধা রাখাইনের যুদ্ধ। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাতের কারণে অঞ্চলটি এখনো অস্থিতিশীল। ওই রাজ্যের বড় একটি অংশ বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাখাইনে সংঘাতের কারণে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। তাদের অধিকাংশই উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছেন।

রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নানা ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেলেও বাস্তবতা হলো তাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা নেই। মূলত, রোহিঙ্গাদের বড় উদ্বেগ প্রত্যাবাসনের পর নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে। ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিস সূত্রমতে, চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়া প্রত্যাবাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

এরপর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকত্বও একটি বড় প্রশ্ন। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের কারণে রোহিঙ্গাদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রহীন অবস্থায় রয়েছেন।

নাগরিকত্ব ও সমানাধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। রোহিঙ্গাদের কাছে একমাত্র সমাধান নিরাপদ প্রত্যাবাসন। ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নানাবিধ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের আন্তরিকতার বিষয়টিই প্রধান।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...