আন্তর্জাতিকরোহিঙ্গাদের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বাড়ছে মৃত্যু ও নিখোঁজ
রোহিঙ্গাদের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বাড়ছে মৃত্যু ও নিখোঁজ
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও শরণার্থী শিবিরের অবনতিশীল পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা বাড়ছে, যেখানে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৮২০ জন নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গাদের সমুদ্রপথে যাত্রা বাড়ছে। পুরোনো মাছ ধরার ট্রলারে গাদাগাদি করে হাজারো রোহিঙ্গা বাংলাদেশ বা মিয়ানমার থেকে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তারা নিরাপত্তা কিংবা জীবিকার সন্ধান করছেন।
জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, এটি বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক সমুদ্রপথ। এই পথে যাত্রা করা প্রতি সাতজনের একজন গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতে, শরণার্থী ও অভিবাসীদের সমুদ্রযাত্রার ক্ষেত্রে এটিই বিশ্বের সর্বোচ্চ মৃত্যুহারের রুট।
গত বছর বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী যাত্রা করেছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০০ জন নিখোঁজ বা নিহত হন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সমুদ্রে ৮২০ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
চলতি বছরের জুনের শেষ নাগাদ প্রায় ৫ হাজার ৭০০ জন এই পথে যাত্রায় অংশ নিয়েছেন। এটি পুরো ২০২৫ সালের সংখ্যার কাছাকাছি। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক যাত্রার খবর জানা যায় না এবং অনেক নৌকা খবরের আড়ালেই ডুবে যায়।
অধিকারকর্মী ও শরণার্থী পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন অনেককে স্বেচ্ছায় নয়, পাচার করে এসব নৌকায় তোলা হচ্ছে। এসব নৌকায় নির্যাতন, শোষণ ও রোগব্যাধি ব্যাপক।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পরিবারের সঙ্গে এক দশক ধরে বাস করা ১৫ বছর বয়সী জানি আলমকে গত জুনের শুরুতে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে অপহরণ করা হয়। দুই মাস পর তাকে জোর করে মালয়েশিয়াগামী একটি নৌকায় তোলা হয়। জানি আলম শেষবার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় কাঁদতে কাঁদতে বিষয়টি জানান।
তার বাবা আবদুল নুর জানান, অপহরণকারীরা মুক্তিপণ হিসেবে প্রায় ২ হাজার ৮০০ ডলার দাবি করেছিল। তিনি আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সেই অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু ছেলেকে আর ফিরে পাননি।
নুরের ধারণা, গত জুলাই মাসে মিয়ানমারের উপকূলের কাছে নিখোঁজ হওয়া দুটি নৌকার একটিতে তার ছেলেও ছিল। ওই বিপজ্জনক যাত্রায় প্রায় ৫০০ জনের মতো মানুষ অংশ নিয়েছিল। নুরের সঙ্গে শেষ আলাপে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোনটি নিয়ে জানায়, ‘আপনার ছেলেকে এখানে বিক্রি করা হয়েছে এবং তাকে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে।’
রোহিঙ্গা অধিকার সংগঠন আরাকান প্রজেক্টের পরিচালক ক্রিস লেওয়া বলেন, কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে ‘অপহরণের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি’ ঘটেছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মানুষ অপহরণ করে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করছে। সমুদ্রপথে পাচারের ব্যবসা বাড়ায় আরও যাত্রী সংগ্রহের চাহিদা তৈরি হয়েছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের গ্রাম থেকে পালিয়ে নুর ও তার পরিবার বাংলাদেশে আসে। রাতে গ্রাম ছেড়ে সাত দিন হেঁটে তারা বাংলাদেশে পৌঁছেছিলেন। ৫৫ বছর বয়সী নুর ছেলের স্মৃতিতে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আশ্রয়ের প্রতিটি কোণ আমাকে তার কথা মনে করিয়ে দেয়।’
একই শিবিরে আরেক পরিবারের ২০ বছর বয়সী শিক্ষক হামিদ উল্লাহকেও গত মে মাসের শুরুতে অপহরণ করা হয়। তার পরিবার প্রথমে ১ হাজার ২০০ ডলার মুক্তিপণ দিতে পারেনি। পরে পাচারকারীরা আরও ৩ হাজার ২০০ ডলার দাবি করে। শেষবার মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় হামিদ উল্লাহ জানিয়েছিলেন, তাকে মালয়েশিয়াগামী একটি নৌকায় তোলা হচ্ছে। এরপর থেকে তার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
গত জুলাই মাসে নিখোঁজ হওয়া দুটি নৌকা গত জুনের শেষ দিকে মিয়ানমার থেকে রওনা হয়েছিল। জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি নৌকায় প্রায় ২৫০ জন এবং অন্যটিতে প্রায় ২৮০ জন ছিলেন। প্রথম নৌকাটি যাত্রার কিছুক্ষণের মধ্যেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দ্বিতীয়টি প্রায় এক সপ্তাহ পর মিয়ানমারের মধ্য উপকূলের কাছে ডুবে যায় বলে ধারণা করা হয়।
সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে এসব যাত্রা হলেও নৌকা দুটি বর্ষা মৌসুমে রওনা হয়েছিল। এই সময়ে সমুদ্রে অনিয়মিত ঝড় ও উঁচু ঢেউয়ের ঝুঁকি থাকে। লেওয়ার মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে যাত্রা কয়েক দফা পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত গত ২৯ জুন নৌকা দুটি ছাড়ে।
প্রথম নৌকাটি সকালে যাত্রা করে এবং মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে ডুবে যায় বলে লেওয়া জানান। উত্তর রাখাইনের উপকূলে ওই নৌকার যাত্রী বলে ধারণা করা প্রায় ১০ রোহিঙ্গার মরদেহ পাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ পুলিশও গত জুলাই মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে দক্ষিণ উপকূল থেকে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে, যেগুলো অভিবাসীবাহী নৌকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
দ্বিতীয় নৌকাটি সন্ধ্যায় যাত্রা করে প্রায় নয় দিন চলার পর গত ৮ জুলাই আন্দামান সাগরে আয়াওয়াদ্দি উপকূলের কাছে ডুবে যায়। লেওয়া জানান, আয়াওয়াদ্দি ও আরও দক্ষিণে মোন রাজ্যের উপকূলে জেলেরা সমুদ্রে বেশ কয়েকটি মরদেহ পাওয়ার খবর দিয়েছে।
মতামত (0)