আন্তর্জাতিকব্রিকস সম্মেলনে আগ্রাসনের নিন্দা, ঐকমত্যে বিশ্বনেতারা
ব্রিকস সম্মেলনে আগ্রাসনের নিন্দা, ঐকমত্যে বিশ্বনেতারা
নয়া দিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম সম্মেলনে ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা জানিয়ে যৌথ ঘোষণায় ঐকমত্যে পৌঁছেছেন নেতারা। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মধ্যে এই অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের মধ্যে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো একটি যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে নেতারা ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা জানিয়ে একটি অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরতে সম্মত হয়েছেন। কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ না করে এমন ভাষায় ঐকমত্যে পৌঁছানোকে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নয়া দিল্লিতে শুক্রবার শুরু হওয়া ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন আজ রবিবার শেষ হচ্ছে। ভারত মণ্ডপমে এই সম্মেলনের মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের সভাপতিত্বে এবারের সম্মেলনে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং গ্লোবাল সাউথের ভূমিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।
গতকাল শনিবার সম্মেলনের আবহ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি ছবি ঘিরে। ছবিতে মোদীকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের হাত ধরে থাকতে দেখা যায়। একই ছবিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোকেও দেখা যায়। মোদী ছবিটি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘BRICS Summit 2026 gets underway in Delhi’।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন শুক্রবার সকালে দিল্লিতে পৌঁছান। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নয়া দিল্লিতে পৌঁছান গতকাল শনিবার। ব্রিকস সম্মেলনের আগে মোদীর সঙ্গে পুতিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর দুই নেতা একই গাড়িতে করে ভারত মণ্ডপমে যান, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণায়’ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ঘোষণায় সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়। পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘোষণাপত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে সরাসরি দায়ী না করে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিরসনে সংলাপ, পরামর্শ ও কূটনীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।
ব্রিকসের এবারের সম্মেলনের আগে যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ভাষা নিয়ে সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। এর আগে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও এ বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
নয়াদিল্লি সম্মেলনের আগে সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত গতকাল শনিবার ভোর পর্যন্ত আলোচনা করে একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছান তারা। ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, তীব্র মতপার্থক্যের মধ্যেও ১১ সদস্যের জোটকে একটি যৌথ ঘোষণায় একমত করানো নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য।
‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’তে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, যা সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ঘোষণায় বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর কথাও বলা হয়েছে। এই অবস্থান মূলত সংঘাতের সামরিক সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি ব্রিকসের আগ্রহকেই তুলে ধরেছে।
ব্রিকসের যৌথ ঘোষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোনো নির্দিষ্ট দেশকে সরাসরি অভিযুক্ত না করে ‘সব ধরনের আগ্রাসন’ ও একতরফা যুদ্ধের বিরোধিতা করা। এর ফলে একই জোটে থাকা পরস্পরবিরোধী অবস্থানের দেশগুলোও একটি অভিন্ন ভাষায় সম্মত হতে পেরেছে। এটি ব্রিকসের বর্তমান বাস্তবতাকেও প্রতিফলিত করে। জোটে এখন ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো মধ্যপ্রাচ্যের ভিন্ন অবস্থানের দেশ রয়েছে। ফলে কোনো একটি পক্ষের পক্ষে সরাসরি অবস্থান না নিয়ে তুলনামূলক একটি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে।
মতামত (0)