জাতীয়

সাঁকোতে আগুন, গুলিবিদ্ধদের হাসপাতালে নেওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালে

সাঁকোতে আগুন, গুলিবিদ্ধদের হাসপাতালে নেওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালে
সাঁকোতে আগুন, গুলিবিদ্ধদের হাসপাতালে নেওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বাঁশের সাঁকোতে আগুন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় এক প্রত্যক্ষদর্শী ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি পুলিশি হামলা ও ইন্টারনেট বন্ধের অভিযোগ করেন।

গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন রাজধানীর বনশ্রী থেকে আফতাবনগরে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করা আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলি ও সাঁকোতে আগুন দেওয়ার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মেহের নামের ২৩ বছর বয়সী এক আইন স্নাতকের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক।

মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে নবম সাক্ষী হিসেবে মেহের সাক্ষ্য দেন। তার জবানবন্দিতে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সকাল ১০টা থেকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচির কথা উঠে আসে। পুলিশ বারংবার এই কর্মসূচিতে বাধা দেয় বলে তিনি জানান।

১৮ জুলাই আন্দোলনকারীরা পুনরায় একই কর্মসূচি পালন করতে গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। পুলিশ, র‌্যাব ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও শটগান থেকে গুলি করেন। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতরে আশ্রয় নিলেও পুলিশ গেটের ভেতরে শটগান ঢুকিয়ে গুলি করে। এই হামলায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০-২৫০ জন এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হন, অনেকে প্রাণ হারান।

ওই দিন ইম্পেরিয়াল কলেজের ছাত্র জিল্লুর শেখ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন বলে মেহের উল্লেখ করেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আন্দোলনকারীরা জিল্লুরের মরদেহ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে নিয়ে আসেন। আহতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং গুরুতরদের আশপাশের হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই দিন রাত থেকে ইন্টারনেট কাজ করছিল না, কারণ সরকার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়।

১৯ জুলাই শুক্রবার, সরকার আগেই সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছিল। মেহের জুমার নামাজ পড়তে আফতাবনগর এ ব্লক মসজিদে যান। সেখানে তিনি ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির পাশে একটি গলির মুখে দাঁড়িয়ে দেখতে পান, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রামপুরা সেতুর ওপর থেকে সাধারণ জনগণ ও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করছেন। তিনি চার-পাঁচজনকে গুলি খেয়ে পড়ে যেতে দেখেন এবং তাদের রিকশায় করে আফতাবনগরের ভেতরের নাগরিক হাসপাতালের দিকে নেওয়া হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেদিকে মানুষ দেখছিল, সেদিকেই গুলি করছিল বলে মেহের জানান। তিনি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখান থেকে বাসায় ফিরে ছাদে যান। ছাদে গিয়ে তিনি দেখতে পান হেলিকপ্টার থেকে টিয়ারশেল, গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড আন্দোলনকারীদের ওপর নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ছাদেও নিরাপদ মনে না করায় তিনি নিচে নেমে আসেন।

বিকেলে মেহের বাসা থেকে বের হয়ে আফতাবনগর ও বনশ্রীর মাঝামাঝি আইডিয়াল স্কুল সংলগ্ন বাঁশের সাঁকোর আফতাবনগর প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ান। সেখানে তিনি বনশ্রীতে বিজিবি ও পুলিশকে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করতে দেখেন। ওই সময় বহু মানুষ সাঁকো পার হয়ে বনশ্রী থেকে আফতাবনগরে চলে আসেন।

পুলিশ তখন আফতাবনগরের দিকেও শটগান দিয়ে গুলি ছুড়তে থাকে। মেহেরের পাশে দাঁড়ানো একজন রিকশাওয়ালা গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ ওই বাঁশের সাঁকোতে আগুন লাগিয়ে দেয় যেন আন্দোলনকারীরা পার হতে না পারেন। মেহের ও অন্য দুজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ রিকশাওয়ালাকে তার রিকশায় করে নাগরিক হাসপাতালে নিয়ে যান।

নাগরিক হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং তার শরীর থেকে কিছু পিলেট বের করা হয়, কিছু পিলেট চিকিৎসকরা বের করতে পারেননি। তারা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সেখানে আরও সাত-আটজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। নাগরিক হাসপাতালের একজন কর্মচারী জানান, ১৯ জুলাই অসংখ্য গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি হাসপাতালে এসেছিলেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন মারা গেছেন।

এই আন্দোলন ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলমান থাকে এবং মেহের নিজেও এর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলা ও গুলিতে সারাদেশে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। মেহের বলেন, আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট বন্ধ করে এই গণহত্যা চালানোর জন্য তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দায়ী।

তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে ইন্টারনেট বন্ধ করে এই গণহত্যা চালানোর জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও সালমান এফ রহমান দায়ী। মেহের এই হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের জন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...