জাতীয়

সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ না পেয়ে বিরোধী দলের কক্ষ ত্যাগ

সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ না পেয়ে বিরোধী দলের কক্ষ ত্যাগ
সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ না পেয়ে বিরোধী দলের কক্ষ ত্যাগ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দশটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের পর সভাপতি পদ না পাওয়ায় বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন। গত বুধবার এ ঘটনা ঘটে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আরও দশটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত বুধবার ২ সেপ্টেম্বর এসব কমিটি গঠিত হয়। এসব কমিটির কোনোটিতেই বিরোধী দলের কোনো সদস্যকে সভাপতি পদ দেওয়া হয়নি।

সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় সংসদে বিতর্ক দেখা দেয়। এই বিতর্কের একপর্যায়ে বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন। তবে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াকআউট করার ঘোষণা দেননি।

এর আগে গত রোববারও সভাপতি পদের বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। জাতীয় সংসদের মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটি রয়েছে, যার মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত এবং ১১টি সংসদ–সংক্রান্ত। এ পর্যন্ত ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার ১৯টি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত।

জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিরোধী দলের আসনসংখ্যা অনুপাতে ১০টিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। তবে তারা এখন পর্যন্ত কেবল সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ পেয়েছে। গত বুধবার দিনের শেষ কার্যসূচি ছিল এই সংসদীয় কমিটি গঠন।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম একে একে দশটি স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে তোলেন। প্রস্তাবগুলো সংসদে পাস হলেও কোনোটিতে বিরোধী দল থেকে সভাপতি দেওয়া হয়নি। এরপর বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, সরকারি দলের আচরণের কারণে বিরোধী দলের সংসদে থাকার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি দলের সঙ্গে বৈঠকে আসনসংখ্যা অনুপাতে বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ ভাগ পাওয়ার কথা ছিল। সরকারি দল সদস্য দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি মানলেও সভাপতি পদের ক্ষেত্রে তা মানছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।

সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সভাপতি কোন দল থেকে কতজন হবে, তা কার্যপ্রণালিবিধিতে নেই, এটি বোঝাপড়ার মাধ্যমে হওয়ার কথা। তিনি জানান, সরকারি দলের পক্ষ থেকে একসময় তাদের দশটি সভাপতির পদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল এবং তালিকাও নেওয়া হয়েছিল।

বিরোধীদলীয় উপনেতা অভিযোগ করেন, সরকারি দল তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে কিছুটা বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি দল নিজেরাই যেভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেটাই তারা প্রয়োগ করছে। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল প্রতিনিধি দিলে তাদের ২৬ শতাংশ কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হবে—সরকারি দলের এমন অবস্থানের সমালোচনা করেন তিনি।

সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, "এটা খুবই ইনডিসেন্ট যে সরকারি দল যখন বলে যে আপনারা এই কমিটিতে আসেন তাইলে আপনাদের এটা দিব। আমরা তো বাচ্চা ছেলে না যে আমাদেরকে ললিপপ দেখায়া দেখায়া আপনি নিয়ে যাবেন।" তিনি আরও বলেন, সরকারি দল শতভাগ সভাপতি পদ নেবে, এই সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারে না।

তিনি উল্লেখ করেন, এটি সংবিধানে নেই এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছা যদি সংসদের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, সেটাই স্বৈরাচার। আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, "স্বৈরাচার অর্থ আমি যা যা চাই এটাই আইন, এটাই আমার আচরণ হবে।" তিনি এই পার্লামেন্টকে এভাবে দেখতে চান না বলে জানান।

সংসদে ও বাইরে বৈষম্য সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, "আমরা আরেকটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চাচ্ছি না।" তিনি বিরোধী দলকে কোনো সভাপতি পদ না দেওয়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি সতর্ক করেন যে, সামনে কমিটি গঠনে এমন হলে তারা সংসদে না-ও থাকতে পারেন।

বিরোধীদলীয় উপনেতার বক্তব্য শেষে বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য আসন ছেড়ে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন। তবে এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহসহ কয়েকজন কক্ষ ত্যাগ করেননি। এ পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ফ্লোর নেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা বক্তব্য দিয়েছেন, কিন্তু তিনি জবাব শুনতে চাচ্ছেন না। তিনি ইঙ্গিত দেন, এটি হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াকআউট না হলেও কার্যত ওয়াকআউটই ছিল। তাহেরের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের সদস্যদের আসনের অনুপাতিক হারে সভাপতি দেওয়া যাবে না, এমন কোনো নিয়ম কোথাও নেই।

তিনি আরও বলেন, সভাপতি পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই এবং অতীতের ইতিহাসেও এর কোনো নজির নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিরোধী দলকে দশটি সভাপতি দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা হয়নি। স্বৈরাচার বিষয়ে বিরোধী দলের বক্তব্যের জবাবে তিনি ২০০১ সালের সংসদে বেগম খালেদা জিয়ার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রসঙ্গ তোলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি যখন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে, তখন তারা গণতন্ত্রের পদ্ধতিকে সুদৃঢ় করে। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সেখানে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি আসনের সংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলকে দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে, সংবিধান সংশোধিত হলে তখন কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে এবং আনুপাতিক হারে বিরোধী দল সভাপতি পাবে।

সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের নাম না দেওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী দল কোনো সহযোগিতায় আসছে না। তিনি এটিকে সাংঘর্ষিক বলেও মন্তব্য করেন।

বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "আপনারা বাইরে রাজনীতি না করে সংসদে আসুন। এখানেই কথা বলি।" তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...