জাতীয়

হুমায়ূন আহমেদের পুরোনো সাক্ষাৎকারে নিয়তিবাদ ও পাঠক সংযোগের কথা

হুমায়ূন আহমেদের পুরোনো সাক্ষাৎকারে নিয়তিবাদ ও পাঠক সংযোগের কথা
হুমায়ূন আহমেদের পুরোনো সাক্ষাৎকারে নিয়তিবাদ ও পাঠক সংযোগের কথা
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ২০০৫ সালের একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারে নিজেকে নিয়তিবাদী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি পাঠকপ্রিয়তা, পুরস্কার এবং তার লেখার সহজ-সরল ভাষা নিয়ে কথা বলেছেন।

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের একটি পুরোনো সাক্ষাৎকার সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারটি ২০০৫ সালের ১১ নভেম্বর তার ৫৮তম জন্মদিন উপলক্ষে একটি শুক্রবারের সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে তিনি তার লেখালেখি, পাঠকপ্রিয়তা এবং ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলেছেন।

রবীন্দ্রনাথের পর তার লেখা সবচেয়ে বেশি প্রচার পেয়েছে এমন মন্তব্যের বিষয়ে হুমায়ূন আহমেদ বলেন, এটি তার প্রতি প্রচণ্ড মমতা ও ভালোবাসা থেকে বলা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, একজন লেখিকা পশ্চিমা গণমাধ্যমে অনেক প্রচার পেয়েছেন কারণ তিনি "কালচার ও ধর্মকে খাটো করে" লেখালেখি করেছেন। পশ্চিমারা এমন লেখকদের নিয়ে মাতামাতি করতে পছন্দ করে বলে তিনি জানান।

পুরস্কার বা নোবেল পুরস্কারের মতো বিষয় নিয়ে তার কোনো ব্যাকুলতা নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "আমার জন্য যেটা নির্ধারিত—আই উইল গেট ইট।" হুমায়ূন আহমেদ নিজেকে "এক অর্থে নিয়তিবাদী" হিসেবে বর্ণনা করেন। নিয়তির হাতে সব ছেড়ে দিয়ে কাজ না করার মধ্যেও তিনি আনন্দ খুঁজে পান বলে জানান।

হাজার হাজার পাঠকের তার প্রতি এই আকুলতা তিনি নিজে বুঝতে পারেন না। তার নাটকে বাকের ভাইকে ফাঁসি থেকে বাঁচানোর জন্য মিটিং-মিছিল-অনশন চলার সময় বিষয়টি তাকে প্রথমবার নাড়া দেয়। একজন বিদেশি এ প্রসঙ্গে তার সঙ্গে দেখা করে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এটা কোত্থেকে এল।

হুমায়ূন আহমেদ মনে করেন, মনোবিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। বইমেলায় বা অন্য কোথাও ভক্তদের অটোগ্রাফ দেওয়ার সময়ও তিনি বুঝতে পারেন না কী কারণে তারা তার বই কেনেন। তিনি এটি বুঝতে চানও না বলে জানান।

তিনি তার লেখার ভাষার সহজ-সরলতাকে তার পাঠকপ্রিয়তার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। বিষয়বস্তু এমনভাবে নির্বাচন করেন যে মানুষের পড়তে হয়। তার নাটক লেখার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

নাটক লেখার সময় তিনি চরিত্রগুলোর জন্য অভিনেতা নির্বাচন মাথায় রাখেন। শুরুতে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ অভিনেতা ঠিক করত, কিন্তু এখন তিনি নিজেই নাটক বানালে শিল্পী খুঁজে বের করতে হয়। সে ক্ষেত্রে নূর ভাই বা জাহিদ হাসানের মতো অভিনেতাদের কথা তার মনে থাকে।

হুমায়ূন আহমেদ নিজে অভিনয় করেন না কারণ তিনি মনে করেন তিনি অভিনয় পারেন না। এটি তার কাছে "অতি কঠিন বিদ্যা" বলে মনে হয়। ক্যামেরার সামনে গেলে তার মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায় এবং স্বর বন্ধ হয়ে আসে, তখন তার দৃষ্টি "উন্মাদের দৃষ্টি"র মতো দেখায়।

বাঙালি পাঠকের মন তিনি খুব ভালোভাবে ধরতে পারেন—এমন কথাকে তিনি "হাস্যকর" মনে করেন। তিনি উল্টোভাবে বলেন, পাঠকেরা তার নার্ভটা ধরতে পারছে। এত পাঠকের নার্ভ ধরা সম্ভব নয়, কিন্তু তার নার্ভ ধরা অনেক সহজ বলে তিনি মনে করেন।

প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘোরা বা তাদের সঙ্গে শীতল ব্যবহার করার অভিযোগ তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তিনি নিজেকে খুবই লাজুক ধরনের মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং কখনোই কোনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের কাছে যাননি। আহমদ ছফা তাকে পছন্দ করতেন এবং তার পাণ্ডুলিপি প্রকাশকদের কাছে নিয়ে গিয়ে প্রথম বই প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন।

হুমায়ূন আহমেদ জানান, তার অসীম সৌভাগ্য যে কখনোই তাকে পাণ্ডুলিপি নিয়ে কোনো প্রকাশকের কাছে যেতে হয়নি, বরং বই ছাপা হয়ে গেলে প্রকাশকরাই তার কাছে এসেছেন। তিনি মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন না এবং প্রকাশকদের সঙ্গেও এমনটি করার প্রশ্নই আসে না বলে জানান।

তিনি নিশ্চিত করেন যে তিনি নিয়মিত আয়কর দেন। বছরে কমপক্ষে ছয়-সাত লাখ টাকা আয়কর দেন বলে তিনি জানান। তিনি অনেক বছর ধরে আয়কর দিচ্ছেন এবং তার উকিলের মতে, তিনি তার সার্কেলে সর্বোচ্চ আয়কর প্রদানকারীদের একজন।

পশ্চিম বাংলায় তার পাঠক ভালো বলে তিনি মনে করেন। সেখানকার বইমেলাতে না গেলেও প্রকাশকদের কাছ থেকে বই বিক্রির ভালো খবর পান। "দেশ পত্রিকা"-তে দীর্ঘদিন লেখার কারণে সেখানে তার পরিচিতি তৈরি হয়েছে।

পশ্চিম বাংলায় নাটক লেখার তাগিদ এখনো পাননি বলে তিনি উল্লেখ করেন। সমরেশ মজুমদার মাঝে মাঝে মিসির আলীকে নিয়ে নাটক করতে চান বলে বলেন, আবার শুভ্র উপন্যাস নিয়ে সিরিয়াল করার কথাও ওঠে। তবে এ সবই কথাবার্তা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে এবং কখনোই বাস্তবায়িত হয় না।

লেখালেখির জন্য তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। অনেকের নির্দিষ্ট সময় থাকলেও, তিনি সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর লেখালেখি শুরু করেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...