স্বাস্থ্যসরকারি হাসপাতালের ৫২% রোগনির্ণয় যন্ত্র অব্যবহৃত: জনস্বাস্থ্য সেবায় গভীর সংকট
সরকারি হাসপাতালের ৫২% রোগনির্ণয় যন্ত্র অব্যবহৃত: জনস্বাস্থ্য সেবায় গভীর সংকট
সরকারি হাসপাতালে ৫২% রোগনির্ণয় যন্ত্র থেকেও নেই | প্রথম আলো
সরকারি হাসপাতালে ৫২% রোগনির্ণয় যন্ত্র থেকেও নেই
আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৫: ৫৯
সরকারি হাসপাতালে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রামের মতো রোগনির্ণয়ের (রেডিও ইমেজিং) যন্ত্র থাকলেও সেগুলো নিয়মিত সেবা দিতে পারছে না। জেলা হাসপাতালগুলোতে এমন সেবার প্রাপ্যতা ৮
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগনির্ণয়ের অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতির অর্ধেকেরও বেশি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, যা রোগীদের জন্য নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক্স-রে এবং আলট্রাসনোগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ রেডিও ইমেজিং যন্ত্রগুলোর ৫২ শতাংশই গত এক বছরে কোনো কাজে আসেনি, ফলে সাধারণ মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) পরিচালিত এই গবেষণায় দেশের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে জেলা, উপজেলা এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো অন্তর্ভুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, জেলা হাসপাতালগুলোতে কাগজে-কলমে রোগনির্ণয় সেবার প্রাপ্যতা ৮৫ শতাংশ দেখানো হলেও, বাস্তবে গত এক বছরে নিয়মিত সেবা চালু ছিল মাত্র ৩৩ শতাংশ। এছাড়াও, এসব হাসপাতালে জরুরি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুতও প্রায়শই কম থাকে, যা সামগ্রিক সেবাকে আরও দুর্বল করে তোলে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি গবেষক দল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের অর্থায়নে এই গবেষণাটি সম্পন্ন করেছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয়দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এর ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কোথায় সমস্যা বিদ্যমান, তা জানতে এই গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নয় মাসব্যাপী এই গবেষণাটি দেশের আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে জরিপ, সাক্ষাৎকার এবং নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে প্রাইমারি, জেলা হাসপাতালগুলোকে সেকেন্ডারি এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে টারশিয়ারি লেভেলে ভাগ করা হয়, যার মধ্যে একটি বিশেষায়িত হাসপাতালও ছিল। গবেষকরা অবশ্য তাদের গবেষণার সীমাবদ্ধতা হিসেবে নমুনার কম পরিমাণকেও উল্লেখ করেছেন।
রোগনির্ণয় যন্ত্রপাতির এই অব্যবহারের পেছনে বেশ কিছু কারণ উঠে এসেছে, যার মধ্যে প্রধানতম হলো যন্ত্রপাতির অকেজো থাকা। প্রায় ৭৯ শতাংশ ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা না থাকা সেবাকে ব্যাহত করেছে। এছাড়াও, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি ১৪ শতাংশ এবং প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্টের অনুপস্থিতি ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সেবার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং স্বাস্থ্য খাতের এই অবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পরিকল্পনার অভাবে অনেক দামি চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক হাসপাতালে এক্স-রে ও অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্টের অভাব রয়েছে।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেনাকাটায় দুর্নীতির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পরিকল্পনা ছাড়া কেনাকাটা এবং দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে জনগণের অর্থের অপচয় হয়েছে। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতের সমস্যার সমাধানে শুধু নীতিমালা বা গবেষণার সুপারিশ যথেষ্ট নয়, যদি চিকিৎসকেরা সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করে ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করেন, রোগীদের পরীক্ষার জন্য সেখানে পাঠান এবং কমিশন গ্রহণ করেন, তাহলে মানুষের জন্য ভালো স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
পিপিআরসির গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতের সাফল্য কেবল বাজেট বরাদ্দ দিয়ে মূল্যায়ন করলে চলবে না, বরং প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করতে পারছে কি না এবং সেই ব্যয় নাগরিকদের জন্য ওষুধ, রোগনির্ণয় সেবা, সচল যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাসেবায় রূপান্তরিত হচ্ছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি। হোসেন জিল্লুর রহমান এই প্রসঙ্গে জোর দিয়ে বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নয়, বরং বরাদ্দের অর্থকে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তর করার সক্ষমতা গড়ে তোলাই জরুরি।
গবেষণায় দেখা গেছে, সব পর্যায়ের হাসপাতালে রোগনির্ণয় যন্ত্রের সেবা পাওয়ার হার ৬৫ শতাংশ হলেও, বাস্তবে গত এক বছরে নিয়মিত এমন সেবা পাওয়া গেছে মাত্র ২৫ শতাংশ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যন্ত্রের সেবা প্রাপ্যতা ৪৬ শতাংশ হলেও নিয়মিত সেবা মিলেছে ১৭ শতাংশ ক্ষেত্রে, আর মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে যথাক্রমে ৫৪ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানগুলো সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের অনুমোদিত ৬ হাজার ৪০৬টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩ হাজার ৮৯২ জন, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৭ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ১২ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ৩৬ শতাংশ পদ শূন্য থাকায় অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী নেই। এই জনবল ঘাটতি সরাসরি সেবাদানে প্রভাব ফেলছে।
এই সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের এবং চলমান, যা কেবল নতুন নয়। দুই বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণাতেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গিয়েছিল। স্বাস্থ্য খাতের সংকটের কারণ শুধু অর্থের অভাব নয়, এর চেয়ে বেশি দায়ী হলো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ একটি বড় সমস্যা, যেখানে ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এর দায়িত্ব পালন করলেও তাদের কার্যক্রম মূলত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সীমিত।
স্থানীয় পর্যায়ে হাসপাতাল নিজস্ব উদ্যোগে মেরামত করতে চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে এবং অনেক যন্ত্র স্থায়ীভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। একটি কার্যকর ডায়াগনস্টিক সেবা চালু রাখতে যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট ও সরঞ্জাম এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে প্রয়োজন, যার যেকোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে পুরো ব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়ে। সরকারের জনবল নিয়োগ পরিকল্পনাতেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, যেখানে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগে গুরুত্ব পেলেও কারিগরি জনবল নিয়োগে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থাতেও সমস্যা রয়েছে, যেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এমএসআর ফান্ডের বড় অংশ এসেনসিয়াল ড্রাগ কোম্পানি (ইডিসিএল) থেকে ওষুধ কেনার জন্য নির্ধারিত থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহের সক্ষমতা সীমিত। সময়মতো ওষুধ সরবরাহ বা বিকল্প উৎস থেকে স্থানীয়ভাবে কেনার অনুমোদন না পাওয়ায় বরাদ্দ অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়। এর আগে ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে ঢাকার তিনটি প্রধান হাসপাতালের নষ্ট যন্ত্রপাতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল, যা এই চলমান সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।
এই গবেষণা ২২টি হাসপাতালকে অন্তর্ভুক্ত করলেও এর চিত্র সারা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং জনবল, যন্ত্রপাতি, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি একটি অপরটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত, শুধু অবকাঠামো বা যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং পুরো ব্যবস্থাপনার সংস্কার প্রয়োজন। জনগণের কাছে কতজন চিকিৎসক বা নার্স নিয়োগ হলো তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং প্রয়োজনের সময় তাঁরা সহজে ও হয়রানি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন কি না, সেটিই সবচেয়ে জরুরি।
মতামত (0)