আন্তর্জাতিকআফ্রিকার প্রকৃত আয়তন দেখাতে জাতিসংঘের নতুন মানচিত্রের পক্ষে ভোট
আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন দেখাতে জাতিসংঘের নতুন মানচিত্রের পক্ষে ভোট
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গতকাল শুক্রবার আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন দেখাতে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন মহাদেশগুলোর আকার বিকৃত করে দেখায়।
গতকাল শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্ব মানচিত্রে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন যথাযথভাবে তুলে ধরতে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। অধিবেশনে ১৬৪টি দেশ এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশনের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো, এতে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো বাস্তবের তুলনায় ছোট এবং উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলো তুলনামূলক বড় দেখায়। ফলে মানচিত্রে আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় একই আয়তনের মনে হয়। বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বড়।
নতুন মানচিত্রটি ২০১৮ সালের ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তবে জাতিসংঘের এই প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, ফলে সদস্য দেশ বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরনো মারকেটর প্রজেকশন ব্যবহার থেকে বিরত রাখা বা নতুন মানচিত্র ব্যবহারে বাধ্য করার সুযোগ নেই। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশাসনে মারকেটর মানচিত্রের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে এই সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন দেশের পাঠ্যক্রম ও প্রযুক্তিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষে এই প্রস্তাব গ্রহণের প্রচারণায় নেতৃত্ব দেয় টোগো। টোগো বলেছে, অসমানুপাতিক মানচিত্রগত উপস্থাপন, বিশেষ করে মারকেটর প্রজেকশনের কারণে তৈরি উপস্থাপন, মানুষের চিন্তাভাবনা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভূরাজনীতি ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে বিশ্ববাসীর সম্মিলিত ধারণায় আফ্রিকা ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের প্রকৃত আয়তন ব্যাপকভাবে ছোট করে দেখানো হয়েছে।
প্রস্তাবটি পাস হওয়ার আগে বক্তব্যে টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট দুসে বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক আলোচনা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক আলোচনা। তিনি যোগ করেন, এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে, তাই আমাদের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, "একটি ন্যায্য মানচিত্র দিয়ে ন্যায্য বিশ্ব শুরু হয়।"
ষোলশ শতাব্দীতে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর সমুদ্রপথে নাবিকদের দিকনির্দেশনার সুবিধার্থে তার মানচিত্র প্রজেকশন তৈরি করেন। ১৫৬৯ সালে চালু হওয়া এই প্রজেকশন প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রচলিত মানচিত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মারকেটর প্রজেকশনের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো, এতে বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলগুলো তুলনামূলক ছোট এবং উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলো তুলনামূলক বড় দেখায়। এই বিকৃতি শুধু ভৌগোলিক বিভ্রান্তিই তৈরি করে না, এর ফলে আফ্রিকা ও দক্ষিণের অন্যান্য অঞ্চলের জনসংখ্যা, সম্পদ ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও মানুষের চোখে তুলনামূলকভাবে ছোট হয়ে আসে।
আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন নিয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে পরিচালিত #CorrectTheMap প্রচারণায় বলা হয়েছে, আফ্রিকার ভেতরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, মেক্সিকো ও ইউরোপের বড় একটি অংশকে জায়গা দেওয়া সম্ভব, এরপরও কিছু এলাকা অবশিষ্ট থাকবে। ২০২৫ সালের আগস্টে আফ্রিকান ইউনিয়নও এই প্রচারণাটিকে সমর্থন করে এবং উদ্যোগটি এগিয়ে নিতে টোগোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
টোগোর এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে ফ্রান্সও। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল ব্যারো জানান, ফ্রান্স মারকেটর প্রজেকশন বাদ দিয়ে ব্যবহার-উপযোগী এবং প্রকৃত ভূপৃষ্ঠের আয়তনের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মানচিত্র ব্যবহার করবে। দেশটি এখন একার্ট ফোর প্রজেকশন ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে, যা ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনের কাছাকাছি।
মারকেটর প্রজেকশনের সমালোচনা অবশ্য নতুন নয়। ইতিহাসবিদ ও ভূগোলবিদদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে, এই মানচিত্রে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব রয়েছে। অধিকারকর্মীদের কেউ কেউ এই প্রবণতাকে ‘কার্টোগ্রাফিক ঔপনিবেশিকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সমালোচকদের মতে, মানচিত্রে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোকে তুলনামূলক বড় এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে ছোট করে দেখানোর ফলে দক্ষিণের দেশগুলোর গুরুত্বও দৃশ্যত কমে যায়। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান কাঠামোগত পক্ষপাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। জার্মান ইতিহাসবিদ আরনো পিটার্স ছিলেন মারকেটর প্রজেকশনের অন্যতম সমালোচক এবং ১৯৭৩ সালে তিনি গল-পিটার্স প্রজেকশনের ভিত্তিতে ‘পিটার্স বিশ্বমানচিত্র’ প্রকাশ করেন।
তবে প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে দেশটির প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসভিচ ভোটের আগে বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি, সমৃদ্ধি বা দেশগুলোর মধ্যে সুসম্পর্কের মতো প্রকৃত সমস্যা নিয়ে মনোযোগ দেওয়ার বদলে সাধারণ পরিষদ ১৬ শতকের মানচিত্র এবং ‘ক্ষতিপূরণ’ ও ‘বোধগত ন্যায়বিচারের’ মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উদ্যোগই জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর কারণ।
টোগো এই বছরের শেষ নাগাদ স্কুলের ভূগোলের বই ও শিক্ষা উপকরণে নতুন মানচিত্র চালু করতে চায়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুসেই বলেন, টোগো অন্যান্য সরকার, স্কুল, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে কয়েক শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত মারকেটর মানচিত্র থেকে সরে এসে ইকুয়াল আর্থ মানচিত্র ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করবে। তিনি মনে করেন, ইকুয়াল আর্থ মানচিত্র বিশ্বকে ‘সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে’।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্যদেশ এবং অন্যান্য অঞ্চলের সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠক করে এই মানচিত্রের ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার উপায় ঠিক করার পরিকল্পনা রয়েছে টোগোর। দুসেই জানান, পরবর্তী পদক্ষেপের আলোচনায় মানচিত্র, জিপিএস ও অন্যান্য অবস্থানভিত্তিক প্রযুক্তি পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোকেও যুক্ত করতে হবে। তিনি এই উদ্যোগকে ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার মোকাবিলায় আফ্রিকার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছেন।
মতামত (0)