ধর্ম

আত্মশুদ্ধি ও নিভৃত ইবাদতের গুরুত্ব

আত্মশুদ্ধি ও নিভৃত ইবাদতের গুরুত্ব
আত্মশুদ্ধি ও নিভৃত ইবাদতের গুরুত্ব
চিরন্তন মুক্তির জন্য আত্মশুদ্ধি অপরিহার্য এবং ডিজিটাল যুগে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিভৃত ইবাদত আত্মিক পরিশুদ্ধির প্রধান উপায়। এটি মানুষের অন্তরকে পবিত্র করে এবং ইখলাস বৃদ্ধি করে।

চিরন্তন মুক্তির জন্য আত্মশুদ্ধি বা তাজকিয়াতুন নাফসকে একমাত্র পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষের ভেতরের অংশ পরিচ্ছন্ন হলে তার চিন্তা, ভাষা, মানবিক আচরণ ও দৈনন্দিনিক সম্পর্কগুলো সুষম হয়ে ওঠে। সমাজে এমন অনেক প্রভাবশালী ও সফল মানুষ থাকেন, যাঁরা লোকচক্ষুর সামনে প্রতাপশালী হলেও নিজেদের মনের দিক থেকে নিঃস্ব।

অন্যদিকে ইতিহাসে এমন বহু মানুষ ছিলেন, যাঁদের সামাজিক প্রতিপত্তি তেমন ছিল না; কিন্তু অন্তরের পরিশুদ্ধি ঘটিয়ে তাঁরা স্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। নবীজির দায়িত্ব ঘোষণার ধারাক্রমে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তিনিই সেই সত্তা, যিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে তাদেরই একজনকে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতগুলো পাঠ করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেন।” (সুরা জুমুআ, আয়াত: ২)

এই আয়াতে গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা শিক্ষার আগে পরিশুদ্ধ হওয়ার বিষয়টি স্থান পেয়েছে। পাত্র অপবিত্র থাকলে তাতে রাখা যেকোনো সুধা বিষাক্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান ডিজিটাল সমাজ ব্যবস্থায় সবকিছুই প্রদর্শনীযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। মানুষ কী খাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে বা কী ভাবছে—সবকিছুই লোকসমক্ষে তুলে ধরছে।

এই সামাজিক প্রদর্শনপ্রিয়তা অনেক সময় মানুষের ধর্মচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনাকেও প্রভাবিত করে। এই ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিভৃত সাধনা একটি শক্তিশালী উপায়। মানুষ যখন সবার অগোচরে একান্ত নির্জনে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায় এবং রাতের নিস্তব্ধতায় জায়নামাজে চোখের জল ফেলে, তখন সেখানে স্তুতি বা করতালির কোনো স্থান থাকে না।

যে ব্যক্তি নীরবে অভাবীর পাশে দাঁড়ায়, সে কৃতজ্ঞতার ফিরিস্তি খোঁজে না। লোকচক্ষুর এই আড়ালটুকুতেই ইবাদতের আত্মা ‘ইখলাস’ বা নিখাদ আন্তরিকতা জন্ম নেয়। কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, “তাদের কেবল এই আদেশ দেওয়া হয়েছিল যে তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে কেবল তাঁরই জন্য আনুগত্যকে একনিষ্ঠ করে।” (সুরা বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫)

রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক রূপ কিংবা ধনসম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি লক্ষ্য করেন তোমাদের অন্তর এবং তোমাদের আমলের দিকে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪) অতীতের মনীষীরা নিজেদের নাম ও পরিচয় লুকিয়ে রাখতেই বেশি পছন্দ করতেন। ফিকাহ শাস্ত্রের ইমাম শাফিয়ি অকপটে বলেছিলেন, “আমার ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষা এই যে মানুষ এই জ্ঞান শিখুক, কিন্তু এর কোনো কিছুর কৃতিত্ব যেন আমার নামের সাথে যুক্ত না হয়।” (আবু নুআইম আল-ইসপাহানি, হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া, ৯/১১৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০২)

যাঁরা গোপনে নেক আমল চর্চা করেন, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে পাঁচটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব তৈরি হয়। প্রথমত, যত বেশি এমন নেক আমল করা হয় যার খবর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, ততই ইখলাস পোক্ত হয় এবং সামাজিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভরতা কমে যায়। দ্বিতীয়ত, এটি অতন্দ্র আত্মসচেতনতা তৈরি করে। নির্জনে অপরাধের সুযোগ পেয়েও যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে তা পরিত্যাগ করে, সে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, “তোমরা তোমাদের কথা গোপনে বলো কিংবা প্রকাশ্যে বলো, নিশ্চয়ই তিনি অন্তরের সব খবর সম্পর্কে সম্যক অবগত।” (সুরা মুলক, আয়াত: ১৩)

তৃতীয়ত, কোলাহলমুখর পৃথিবীর ব্যস্ততা থেকে সরে এসে নিভৃতে সময় কাটালে হৃদয়ে গভীর নীরবতা নেমে আসে। কোরআনের ভাষায় বলা হয়েছে, “জেনে রেখো, কেবল আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮) চতুর্থত, গোপন ইবাদতে অভ্যস্ত অন্তর সহজে স্খলিত হয় না। প্রলোভন কিংবা আদর্শিক সংকটের ঝড়ে সেই ব্যক্তিই স্থির থাকে, কারণ তার সম্পর্কের খুঁটি অদৃশ্যের শক্ত জমিনে পোঁতা থাকে।

পঞ্চমত, জীবনের নির্জন মুহূর্তগুলো যিনি রবের আনুগত্যে সাজিয়েছেন, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি নিরাশ হন না। পূর্বসূরি বুজুর্গরা শেষ জীবনে শুভ পরিণতির (হুসনুল খাতিমা) আশায় অন্তত একটি গোপন আমল সঞ্চয় করে রাখতেন। ঘরের দরজা যখন বন্ধ হয়ে যায়, চারপাশের পরিচিত মানুষের চোখ যখন আড়ালে থাকে এবং কেবল নিজের একাকী অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকে, তখনকার আচরণই মানুষের আসল বিশ্বাসকে নির্দেশ করে। প্রদর্শনীর এই শোরগোলের যুগে নিজের ভেতরটা আলো দিয়ে ভরিয়ে তুলতে চাইলে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিভৃত সাধনার কোনো বিকল্প নেই।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...