ধর্ম

কাজা নামাজের বিধান ও বিতর্কিত মতবাদ

কাজা নামাজের বিধান ও বিতর্কিত মতবাদ
কাজা নামাজের বিধান ও বিতর্কিত মতবাদ
ইসলামে ছুটে যাওয়া নামাজ আদায়ের বিধান নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়। অনিচ্ছাকৃত ও ইচ্ছাকৃত উভয় ক্ষেত্রেই কাজা নামাজের গুরুত্ব এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন মতবাদ নিয়ে আলেমদের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।

দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যস্ততা, অলসতা অথবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে অনেকেরই নিয়মিত নামাজ ছুটে যায়। ইসলামে নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা ফরজ। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর সেই নামাজ আদায়ের সুযোগ আছে কিনা, কিংবা ইসলামি শরিয়তে কাজা নামাজ বলতে আদৌ কিছু আছে কিনা, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।

ইসলামি আইনশাস্ত্রে (ফিকহ) ফরজ আমল আদায়ের দুটি রূপ রয়েছে। এর একটি হলো শরিয়ত নির্ধারিত সময়ের ভেতরে নামাজ আদায় করা। অন্যটি হলো নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ছুটে যাওয়া নামাজ পরবর্তীতে পড়ে দায়িত্বমুক্ত হওয়া। আল্লাহ–তাআলা নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’

ওয়াক্ত পার হয়ে গেলে সেই নামাজ আল্লাহর ‘ঋণ’ হিসেবে বান্দার ওপর থেকে যায় কিনা, তা-ই কাজা নামাজের মূল প্রতিপাদ্য। খন্দকের যুদ্ধের সময় কাফেরদের তীব্র আক্রমণের কারণে রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের আসরের নামাজ ওয়াক্তমতো আদায় করা সম্ভব হয়নি। সূর্যাস্তের পর তিনি প্রথমে আসরের কাজা এবং পরে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন।

ইসলামে কাজা নামাজের অস্তিত্ব হাদিসের স্পষ্ট বিবরণ এবং মুসলিম মনীষীদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) দ্বারা প্রমাণিত। অনিচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ছুটে গেলে, যেমন ঘুম বা ভুলে যাওয়ার কারণে নামাজ কাজা হলে তা স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আদায় করা ফরজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নামাজের কথা ভুলে যায় কিংবা ঘুমের কারণে তা ছুটে যায়, তার কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হলো—যখনই তার মনে পড়বে, তখনই সে তা আদায় করে নেবে।’ অনিচ্ছাকৃত কাজা আদায়ের ব্যাপারে সব যুগের আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে।

কোনো যুক্তিসঙ্গত অপারগতা ছাড়া ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগ করা মহাপাপ (কবিরা গুনাহ)। এটি চার মাজহাবের সর্বসম্মত মত। তবে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও খাঁটি তওবার পাশাপাশি পূর্বের সব ছুটে যাওয়া নামাজের কাজা আদায় করা আবশ্যক। ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগকারীর নামাজ জিম্মায় দায় হিসেবে থেকে যায় এবং তা কাজা করা ছাড়া দায়মুক্ত হওয়া যায় না।

ইচ্ছাকৃত নামাজ ত্যাগের পরও অনুতপ্ত হয়ে পূর্বের নামাজ কাজা আদায় করা ফরজ। ইমাম শাফিয়ি যুক্তি দেন যে, ঘুমন্ত ব্যক্তির যদি কাজা লাগে, তবে অবহেলাকারীর ক্ষেত্রে কাজা আদায় আরও বেশি প্রযোজ্য। অনুতপ্ত নামাজ ত্যাগকারী ইসলামের ওপর অটল থাকলে তার অতীত জীবনের নামাজ ধারাবাহিকভাবে কাজা করতে হবে।

কাজা নামাজ নিয়ে কিছু ফকিহ ও আলেমের মধ্যে ভিন্নমত দেখা যায়। ইমাম ইবনে হাজম, ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়্যিম প্রমুখ মত দেন যে, ইচ্ছাকৃত নামাজ ছাড়লে পরবর্তী সময়ে আর কাজা হয় না। তাঁদের মূল যুক্তি হলো, ওয়াক্ত আসার আগে যেমন নামাজ হয় না, তেমনি ওয়াক্ত চলে যাওয়ার পরও তা পড়ার সুযোগ নেই।

তাঁরা আরও যুক্তি দেন যে, হাদিসে শুধু ঘুমন্ত ও ভুলোমনা ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে। কোনো ক্ষমার যোগ্য অপারগ ব্যক্তির বিধানকে ইচ্ছাকৃত অপরাধীর ওপর চাপানো ঠিক নয়। শরিয়তে সময় পার হয়ে যাওয়ার পর ইচ্ছাকৃত ত্যাগকারীর জন্য নতুন কোনো কাজা করার সরাসরি আদেশ আসেনি। রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন ফরজের ঘাটতি থাকলে আল্লাহ নফল দিয়ে তা পূরণ করবেন। তাই তাঁদের মতে, কাজা না পড়ে বেশি বেশি নফল পড়া উচিত।

সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ (জমহুর ওলামা) এই সন্দেহের জবাব দিয়েছেন। তাঁদের অগ্রাধিকারমূলক যুক্তি হলো, কোনো অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও যদি ঘুম বা বিস্মৃতির কারণে আল্লাহর হক বাতিল না হয়ে কাজা করা লাগে, তবে অবহেলাকারী অপরাধীর ক্ষেত্রে নামাজ মাফ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তার দায় আরও কঠোর।

তাঁরা বলেন, আল্লাহর প্রাপ্য ঋণ পরিশোধ করাই সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। নামাজ হলো একটি ঋণ; সময় পার হলেও বান্দার কাঁধ থেকে এই ঋণ দূর হয় না। এছাড়া রোজার বিধানের সাদৃশ্যও তাঁরা তুলে ধরেন। রমজানের রোজা ইচ্ছাকৃত ভাঙলে সবার মতেই কাজা করা আবশ্যক।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...