ধর্মগোত্রপ্রধানের ইসলাম গ্রহণ ও শাহাদাত: ছেলেদের অভিনব কৌশল
গোত্রপ্রধানের ইসলাম গ্রহণ ও শাহাদাত: ছেলেদের অভিনব কৌশল
মদিনার এক গোত্রপ্রধানের ছেলেরা তার মূর্তি পূজার অবসান ঘটাতে এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন, যা তাকে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করে এবং পরবর্তীতে তিনি ওহুদ যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।
মদিনার বনু সালামা গোত্রের প্রধান ছিলেন আমর ইবনুল জামুহ। তিনি অত্যন্ত দানশীল, প্রভাবশালী ও সমাজে সর্বজনশ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তি ছিলেন। জন্মগতভাবে তার একটি পা কিছুটা দুর্বল ও খোঁড়া ছিল, যার কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারতেন না। তৎকালীন আরবের গোত্রপ্রধানদের আভিজাত্যের প্রথা অনুযায়ী তার ঘরে ‘মানাত’ নামক একটি কাঠের মূর্তি স্থাপিত ছিল। তিনি গভীর ভক্তি সহকারে ঘরে বসেই সেই মূর্তির পূজা করতেন।
নবীজির মদিনায় হিজরতের আগেই তার তিন পুত্র—মুআজ, মুআউয়িজ ও খাল্লাদ এবং স্ত্রী হিন্দ ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী (সা.) মদিনার মানুষদের দ্বীন শেখানোর জন্য যে তরুণ সাহাবি মুসআব ইবনে ওমাইরকে পাঠিয়েছিলেন, তার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় পরিবারটি ইমানের আলো লাভ করে। গোত্রপ্রধান পিতার সামাজিক প্রভাব ও ক্ষোভের আশঙ্কায় তারা তাদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি শুরুতে গোপন রাখেন। পরিবারের সদস্যরা মনেপ্রাণে চাইতেন তাদের শ্রদ্ধেয় পিতা যেন জাহেলি যুগের অন্ধকার থেকে ইসলামের মুক্তপথে আসেন।
কিন্তু সরাসরি কিছু বলতে না পেরে তারা এক অভিনব কৌশলের আশ্রয় নেন। এক রাতে ছেলেরা গোপনে পিতার সেই কাঠের মূর্তিটি উঠিয়ে নিয়ে মহল্লার আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমর ইবনুল জামুহ মূর্তিকে বেদিতে না পেয়ে ব্যাকুল হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। অবশেষে তিনি নোংরা স্তূপ থেকে মূর্তিটি উদ্ধার করে পরম যত্নে ধুয়ে-মুছে সুগন্ধি মাখিয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করেন।
পরপর কয়েক দিন একই ঘটনা ঘটায় এবার তিনি বিরক্ত হয়ে মূর্তির গলায় একটি ধারালো তরবারি ঝুলিয়ে দেন। তিনি মূর্তিটিকে বলেন, ‘যদি তোমার মধ্যে কোনো ক্ষমতা থাকে, তবে এই তরবারি দিয়ে পারলে নিজেকে রক্ষা করো।’ পরদিন সকালে উঠে তিনি দেখলেন মূর্তিটি আবার গায়েব। খুঁজতে খুঁজতে বনু সালামার এক পরিত্যক্ত নোংরা কুয়ায় তিনি আবিষ্কার করলেন এক চরম অবমাননাকর দৃশ্য। তার পরম ভক্তির উপাস্য কাঠের মূর্তিটি একটি মৃত কুকুরের সঙ্গে একই রশিতে বাঁধা অবস্থায় আবর্জনার মধ্যে পড়ে আছে।
গলায় তরবারি ঝুলিয়েও যে নির্জীব কাষ্ঠখণ্ড একটি মৃত পশুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে না, তা কীভাবে বিশ্বজগতের প্রতিপালক বা মানুষের আশ্রয় হতে পারে, এই চরম সত্য সেদিন তার বিবেককে নাড়া দেয়। তিনি গভীরভাবে লজ্জিত হন এবং মূর্তির উপাসনার অসারতা উপলব্ধি করেন। কালবিলম্ব না করে তিনি সরাসরি নবীজির কাছে গিয়ে পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন।
এরপর কেটে যায় তিনটি বছর। ঘনিয়ে আসে ওহুদের ঐতিহাসিক যুদ্ধ। মদিনাজুড়ে জিহাদের প্রস্তুতি চলছিল। ছেলেরা এসে বৃদ্ধ পিতাকে পরম স্নেহে বললেন, ‘বাবা, আপনার পা দুর্বল এবং ইসলামে আপনার মতো অক্ষম ব্যক্তির জন্য জিহাদ থেকে অব্যাহতির স্পষ্ট বিধান রয়েছে; কাজেই আপনার যুদ্ধে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।’ কিন্তু ইমানের তাপে প্রজ্বলিত সেই বৃদ্ধ সরদার ঘরে বসে থাকতে রাজি হলেন না। তিনি নবীজিকে অনুযোগের সুরে বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমার ছেলেরা আমাকে আপনার সঙ্গে বেহেশতে যাওয়ার পথ থেকে আটকে রাখতে চায়। অথচ আল্লাহর কসম, আমি আমার এই দুর্বল পা নিয়েই বেহেশতের সবুজ চত্বরে হেঁটে বেড়াতে চাই!’
বার্ধক্য ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তার ইমানি উদ্দীপনা দেখে মহানবী (সা.) ছেলেদের ডেকে বললেন, ‘তোমরা তাকে আর বাধা দিয়ো না; হয়তো আল্লাহ তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করবেন।’ অনুমতি পেয়ে তিনি আনন্দচিত্তে ছেলেদের সঙ্গে ওহুদ প্রান্তরে রওনা হলেন। বের হওয়ার সময় কাবার দিকে ফিরে ব্যাকুল হৃদয়ে দোয়া করলেন, ‘আল্লাহ, আমাকে শাহাদাতের অমূল্য নিয়ামত দান করুন এবং হতাশ হয়ে যেন আবার পরিবারের কাছে ফিরে আসতে না হয়!’
ওহুদের ময়দানে পা টেনে টেনেই তিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সেই অসম যুদ্ধের অগ্রবর্তী সারিতে পৌঁছে যান। পাশেই লড়াই করছিলেন তার পুত্র খাল্লাদ। বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের একপর্যায়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে পিতা-পুত্র উভয়ই শহীদ হন। যুদ্ধ শেষে নবীজি শহীদদের দেখতে এসে আমর ইবনুল জামুহের নিথর দেহের পাশে দাঁড়ালেন। পরম মমতায় তার দিকে তাকিয়ে এক ঐতিহাসিক সুসংবাদ দিলেন, ‘আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তুমি তোমার এই দুর্বল পা নিয়েই বেহেশতে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় স্বচ্ছন্দে হেঁটে বেড়াচ্ছ!’
মতামত (0)