জাতীয়

বাংলাদেশে শিশু দত্তক ও অভিভাবকত্বের আইনি প্রক্রিয়া

বাংলাদেশে শিশু দত্তক ও অভিভাবকত্বের আইনি প্রক্রিয়া
বাংলাদেশে শিশু দত্তক ও অভিভাবকত্বের আইনি প্রক্রিয়া
বাংলাদেশে শিশু দত্তক নেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই, তবে আদালতের মাধ্যমে শিশুর অভিভাবকত্ব নেওয়া যায়। মুসলিম আইনে দত্তক নিষিদ্ধ হলেও হিন্দু ধর্মে নির্দিষ্ট শর্তে দত্তকের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশে নিঃসন্তান দম্পতিদের মধ্যে শিশু দত্তক নেওয়া নাকি অভিভাবকত্ব গ্রহণ করা—এই প্রশ্নটি প্রায়শই দেখা যায়। দেশে শিশু দত্তক নেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় সাধারণত শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া যায়।

বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফ সালেহীন (ছদ্মনাম) জানান, বিয়ের সাত বছর পর সন্তান না হওয়ায় তিনি দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আইনি জটিলতা এড়াতে তিনি ছয় বছর আগে ২০১৯ সালে স্ট্যাম্প কাগজে সই করে একটি শিশু দত্তক নেন। তিনি বলেন, তার দত্তক নেওয়া মেয়েটি তার আসল বাবা-মায়ের ষষ্ঠ সন্তান ছিল এবং তার বয়স যখন আঠারো দিন, তখন স্ট্যাম্পে চুক্তি করে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে তাকে নেওয়া হয়।

আইনজীবীরা বলছেন, এভাবে স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করে সন্তান দত্তক নেওয়া আইনসিদ্ধ নয়। প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব ‘পারসোনাল ল’ অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। প্রতিটি ধর্মের আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় বিধান দ্বারা পরিচালিত নিয়মই মূলত ‘পারসোনাল ল’ হিসেবে পরিচিত।

দেশের একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা লুৎফা নাজনীন (ছদ্মনাম) বিয়ের এগারো বছরেও সন্তান না হওয়ায় বছর দুয়েক আগে শিশু দত্তক নেওয়ার কথা ভাবেন। পরিচিতদের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, দেশে দত্তক আইন নেই, তবে আদালতের মাধ্যমে শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া সম্ভব। তিনি আজিমপুরের সরকারি শিশু সদনে খোঁজ নিয়ে দেড় মাস বয়সী একটি মেয়ে শিশুকে পছন্দ করেন, যাকে তিন দিন বয়সে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফেলে যাওয়া হয়েছিল।

নাজনীন ওই শিশুটিকে নেওয়ার জন্য পারিবারিক আদালতে আবেদন করেন। আদালতে বেশ কয়েক মাস শুনানির পর কিছু শর্ত সাপেক্ষে তিনি শিশুটির অভিভাবকত্ব পান। আদালত শিশুটির কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পড়ালেখার খরচ বাবদ একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা এফডিআর করে দিতে বলেন, যার প্রমাণ হিসেবে সরকারি অফিসে রশিদ জমা দেওয়া হয়। নাজনীন জানান, আদালত তার দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে অভিভাবক করে রায় দেন। তবে এই আইনি প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং আদালতসহ সরকারি বিভিন্ন কার্যালয়ে দৌড়-ঝাঁপ করতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আইনজীবীরা জানান, মুসলিম আইনে সন্তান দত্তক নেওয়ার কোনো বিধান নেই। যে কথা প্রায়শই শিশু দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে শোনা যায়, সেটি আসলে দত্তক নয়, বরং শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া। আইনি এই প্রক্রিয়ায় শিশুকে নিজের জিম্মায় রাখা যায়, কিন্তু এটি পুরোপুরি মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের অধিকার দেয় না। ফলে অভিভাবকত্ব পাওয়া এবং দত্তক নেওয়া দুটি ভিন্ন বিষয়।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন এবং ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়াহ) অনুযায়ী এতিম বা অসহায় শিশুকে লালন-পালন করা যায়। তবে সন্তানের মা-বাবার নামের জায়গায় লালনপালনকারী মা-বাবার নাম ব্যবহার করা যায় না, কারণ ইসলামে এর বৈধতা নেই। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলেন, ‘গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট - ১৮৯০’ অনুযায়ী যে কেউ কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব পেতে পারেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মুসলিম আইনে দত্তকের ধারণা নেই, তাই গার্ডিয়ানশিপ পাওয়া আর দত্তক নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান।

মিতি সানজানা জানান, যদি কোনো সন্তানকে নিয়ে বিরোধ না থাকে, তবে অল্প কয়েকটি শুনানির মাধ্যমে আইনি এই প্রক্রিয়ায় আগ্রহীরা অভিভাবকত্ব পান। তবে যদি কোনো বিরোধ বা জটিলতা থাকে, তবে প্রক্রিয়াটি অনেক দীর্ঘ হয়। রায় বিরুদ্ধে গেলে আপিল করার সুযোগেও এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। এ ধরনের আবেদনের ক্ষেত্রে আদালত শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থ ও সর্বোত্তম কল্যাণ বিবেচনা করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

হিন্দু ধর্মে উত্তরাধিকার আইন (সংশোধিত) অনুযায়ী সন্তান দত্তক নেওয়া যায়। এই আইনে দত্তক সন্তান ও জৈবিক সন্তানের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয় না। উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশের পর শুধু ছেলে সন্তানের ক্ষেত্রে দত্তকের বিষয়টি আইনসিদ্ধ হয়েছে। অর্থাৎ, এই আইনে শুধু ছেলে শিশুই দত্তক নেওয়া যাবে। এই আইনে অভিভাবকত্ব নয়, দত্তককেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হিন্দু পুরুষ বিবাহিত, অবিবাহিত বা বিপত্নীক যেকোনো পর্যায়ে দত্তক নিতে পারবেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...