জাতীয়সার সংকট নিয়ে সংসদে উত্তাপ, কৃষকের দুর্ভোগের অভিযোগ
সার সংকট নিয়ে সংসদে উত্তাপ, কৃষকের দুর্ভোগের অভিযোগ
সরকারের পর্যাপ্ত সারের মজুতের দাবি সত্ত্বেও কৃষকদের সার সংকটে ভোগার অভিযোগ উঠেছে। কালোবাজার থেকে চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে, এমনকি গুদাম লুটের ঘটনাও ঘটেছে। সংসদ সদস্যরা এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
দেশে পর্যাপ্ত সারের মজুত থাকার সরকারি দাবির বিপরীতে কৃষকদের সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিরোধী দল দাবি করেছে, কৃষকদের কালোবাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কোথাও কোথাও কৃষকরা গুদাম লুট করতে বাধ্য হয়েছেন এবং বিজিবি মোতায়েন করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে ‘দেশজুড়ে তীব্র সার সংকটে সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ’ শীর্ষক এক আলোচনায় সংসদ সদস্যরা এসব কথা বলেন। জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এই আলোচনা উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, চলমান সার সংকট মূলত মজুতের সমস্যা নয়, বরং সরকারের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নাজিবুর রহমান ভর্তুকির সার মিয়ানমারে পাচার হয়ে তার বিনিময়ে দেশে ইয়াবা আসার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এটি দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সরকারের অতীত দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার প্রথমে লোডশেডিং নেই দাবি করলেও পরে জ্বালানি সংকট নিয়ে দিন গোনার কথা জানায়।
সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা মূলত ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। তিনি অভিযোগ করেন, সার কারখানা বন্ধ রেখে জনগণের অর্থে বেশি দামে সার কেনা হচ্ছে, অথচ সেই সার কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না। এটি সরকারের চরম ব্যর্থতা বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নতুন ডিলার নিয়োগেরও সমালোচনা করেন তিনি। নাজিবুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলের ডিলারদের বাদ দেওয়া ঠিক আছে, কিন্তু লাখ লাখ টাকা নিয়ে যেসব দলীয় লোককে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তাদের মাধ্যমে কোনো দুর্নীতি হলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।
জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই; বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সার মজুত রয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররাই সরকারকে হেয় করার উদ্দেশ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সংকট মোকাবিলায় সারা দেশে নতুন করে প্রায় পাঁচ হাজার ডিলার নিয়োগ করা হচ্ছে। এসব ডিলারের অধীনে আরও ১৬ হাজার খুচরা ডিলার নিয়োগ করা হবে। তিনি বলেন, আগের সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ৩ হাজার ৭৫৯ জন সার ডিলার বর্তমানে পলাতক।
এসব ডিলার পয়েন্ট শূন্য থাকায় সারের সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থা সচল রাখতে নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় কমবেশি ৪ হাজার ৯১৮ জন নতুন ডিলার নিয়োগ করা হবে, এবং প্রত্যেক ডিলার আবার দুটি করে খুচরা ডিলার নিয়োগ করতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশে সারের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারে সার পাচারের কিছু তথ্য প্রশাসনের হাতে এসেছে।
সার মনিটরিং কমিটিতে সংসদ সদস্যদের না রাখার বিষয়ে বিরোধী দলের ক্ষোভের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার বিতরণের দায়িত্ব সংসদ সদস্যরা নিতে চান না, ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যরাও নিতে চান না। তাই সার বিতরণের দায়িত্ব নিয়ম অনুযায়ী ডিলারদেরই পালন করতে হবে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, সরকার বলছে দেশে সারের জোয়ার বইছে, অথচ কৃষকদের ন্যায্যমূল্যের চেয়ে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে ছয়টিই বন্ধ রয়েছে এবং মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গোডাউন সারে ভর্তি।
শফিকুল ইসলাম মাসুদ দাবি করেন, ভর্তুকির সার মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং এর বিনিময়ে দেশে আইস ও ইয়াবার মতো ভয়ংকর মাদক ঢুকছে। তিনি ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বলেন, বর্তমানে ডিলার নিয়োগে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হচ্ছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছর ধরে সক্রিয় একটি চক্রের সঙ্গে মিলে কোনো কোনো ডিলার নিজের নামে, স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়ের নামেও ডিলারশিপ নিচ্ছেন।
খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৫০ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে বলে তিনি জানান। শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, দুর্নীতি ও দলীয়করণ ওপর থেকে নির্মূল করা না গেলে শুধু গাছের পাতা ছিঁড়ে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তিনি সার সংকটের কারণে আগামী রবি ও বোরো মৌসুমে দেশ গুরুতর খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
মতামত (0)