খেলাধুলাবাংলাদেশের টেস্ট ওপেনিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব, চার বছরে নেই কোনো সেঞ্চুরি
বাংলাদেশের টেস্ট ওপেনিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব, চার বছরে নেই কোনো সেঞ্চুরি
বাংলাদেশের টেস্ট ওপেনিংয়ে দীর্ঘদিনের সংকট চলছে। গত চার বছরে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে কোনো সেঞ্চুরি আসেনি, এবং তামিমের অবসরের পর সাত ওপেনারের মধ্যে মাত্র ১০টি ফিফটি এসেছে।
বাংলাদেশ দলের অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে সামনে রেখে কিছু পরিকল্পনা চোটের কারণে ব্যাহত হয়েছে। লিটন দাস ও শরীফুল ইসলাম প্রথম টেস্টের দলে নেই, নাহিদ রানা পুরো সিরিজেই থাকছেন না। তাঁদের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে নির্বাচকদের বেগ পেতে হয়েছে।
নাহিদ রানা না থাকায় পেস বোলিংয়ের ভারসাম্য এবং লিটন দাসের অনুপস্থিতিতে লোয়ার অর্ডারের শূন্যতা পূরণে নির্বাচকদের কঠিন হিসাব কষতে হয়েছে। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে একটি স্থিতিশীল দল নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। তবে চোটের পাশাপাশি ওপেনারদের ফর্মহীনতা বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশ যে তিনজন ওপেনারকে নিয়ে যাচ্ছে, তাঁদের দুজন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচে ছিলেন না। তানজিদ হাসান এখন পর্যন্ত মাত্র একটি টেস্ট খেলেছেন। সৌম্য সরকার পাঁচ বছর পর এই ফরম্যাটে ফিরেছেন।
তাঁদের সঙ্গে ওপেনিংয়ে প্রথম পছন্দ হিসেবে সাদমান ইসলামকে বিবেচনা করা হচ্ছে। তানজিদ হাসান আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে শুরুতে দ্রুত রান এনে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। সৌম্য সরকারের ক্ষেত্রে পেসবান্ধব উইকেটে ভালো করার অভিজ্ঞতা দলের ভরসা।
ঘরোয়া ক্রিকেটের ফর্মের পাশাপাশি এমন গুরুত্বপূর্ণ সিরিজে দলকে এসব কৌশলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। টেস্টে ওপেনিং জুটি নিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘ দিন ধরে সংকটে ভুগছে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের কোনো ওপেনারের সর্বশেষ সেঞ্চুরি এসেছিল প্রায় চার বছর আগে ভারতের বিপক্ষে।
সেই সেঞ্চুরি করা জাকির হাসান তাঁর শেষ ১৩ ইনিংসে কোনো ফিফটি না পেয়ে টেস্ট দল থেকে দূরে রয়েছেন। এর আগে ২০২২ সালের মে মাসে সেঞ্চুরি করা তামিম ইকবাল এখন বিসিবি সভাপতি। দীর্ঘদিন ধরে তিনিই ওপেনিংয়ে দলের প্রধান ভরসা ছিলেন।
তামিমের অবসরের পর বাংলাদেশের হয়ে আরও সাতজন ব্যাটসম্যান ওপেনিংয়ে নেমেছেন। ২১ ম্যাচে তাঁদের কোনো সেঞ্চুরি নেই, ফিফটি এসেছে মাত্র ১০টি। এই সময়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন।
গত দুই বছরে ওপেনিংয়ের এই সংকট আরও গভীর হয়েছে। মাহমুদুল হাসান গত বছর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এবং সাদমান ইসলাম জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন। তবে ম্যাচগুলো টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ ছিল না।
তামিম ইকবালের অবসরের পর এই দুজনই সবচেয়ে বেশি ইনিংসে ওপেন করেছেন। তবে এই ১০ ইনিংসের কোনোটিতেই তাঁদের উদ্বোধনী জুটি পঞ্চাশ রান পেরোয়নি। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর মাহমুদুলের ফর্মেও অবনতি হয়েছে।
শেষ ৬ ইনিংসের চারটিতেই তিনি এক অঙ্কের ঘরে আউট হয়েছেন। এরপর নির্বাচকেরা তাঁকে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দলেই রাখেননি। ওপেনারদের ধারাবাহিক ব্যর্থতার ধারায় মাহমুদুল হাসান নতুন কোনো নাম নন।
মাঝে এনামুল হক ও জাকির হাসানও ব্যর্থতার তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। ২০২৩ সালের শুরু থেকে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের ওপেনারদের ব্যাটিং গড় সবচেয়ে খারাপ। ইনিংসপ্রতি উদ্বোধনী জুটিতে এসেছে মাত্র ২০.১৭ রান।
এই সময়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে কোনো সেঞ্চুরি না পাওয়া একমাত্র দেশ হলো বাংলাদেশ। এই সংকটকে সঙ্গী করেই বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া সফরে যাচ্ছে। প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজলউডদের গতি ও বাউন্স সামলাতে ওপেনারদের যে হিমশিম খেতে হবে, তা নিয়ে দলের ভেতরেও দুশ্চিন্তা রয়েছে।
দেশ ছাড়ার আগের সংবাদ সম্মেলনে টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেনও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে নাজমুল হোসেন গত পরশু ওপেনারদের চ্যালেঞ্জের দিকটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “ওপেনিং নিয়ে অনেক কথা হয়; কারণ, ও রকম ধারাবাহিক পারফর্ম তারা করে না। তবে ওপেনিং পজিশনটাও অনেক কঠিন, এটাও বুঝতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সব সময় অনেক চ্যালেঞ্জ থাকে। কখনো দিনের ৫ ওভার বাকি তখন নামতে হচ্ছে, আবার কখনো ভেজা উইকেটে ব্যাটিং করতে হচ্ছে।” নাজমুল হোসেনের মতে, সেই চ্যালেঞ্জ সামলানোর জন্য ওপেনারদের চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই।
সব দলের ওপেনারদের জন্যই এখন টেস্ট সত্যিকারের পরীক্ষা নিয়ে হাজির হয়। পেসারদের বৈচিত্র্যের কারণে গতি, সুইং ও বাউন্স সবকিছুই সামলে নিতে হয় তাঁদের। সময়ের সঙ্গে বাকি ব্যাটসম্যানদের জন্য তা সহজ হয়।
ওপেনিংয়ে কাজটা তাই কঠিন, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে ওপেনিং জুটি যদি শুরুর ওই কঠিন সময়টুকু পার করে দলকে একটি ভালো রানের ভিত গড়ে দিতে না পারে, তাহলে ওই টেস্টে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষার সিরিজে তাই ওপেনারদের ফর্মে ফেরার দিকে তাকিয়ে থাকবে বাংলাদেশ দল।
মতামত (0)