জাতীয়বানরুটির মূল্যবৃদ্ধি ও মজুরি বৈষম্য: শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক সংকট
বানরুটির মূল্যবৃদ্ধি ও মজুরি বৈষম্য: শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক সংকট
বানরুটির মূল্যবৃদ্ধি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। একই সময়ে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও, ২০টি শিল্প খাতে পুরোনো মজুরি কাঠামো সংশোধনে বিলম্ব হচ্ছে, যা ব্যাপক মজুরি বৈষম্য তৈরি করছে।
বানরুটির দাম বাড়ায় দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অনেক পরিবার এখন দিশাহারা হয়ে পড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি নিচুতলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
একই সময়ে, রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিছু গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই বেতন বৃদ্ধির লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়কে যৌক্তিক করা।
দীর্ঘদিন ধরে দেশে ৮-৯ শতাংশের বেশি হারে মূল্যস্ফীতি ঘটছে। এই মূল্যস্ফীতির প্রভাব ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার ঘরেই লাগছে। তবে অল্প আয়ের শ্রমজীবীদের অবস্থা এতে বিশেষভাবে করুণ হয়ে উঠেছে।
বানরুটির দাম বৃদ্ধি নিচুতলার মানুষের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। নীতিনির্ধারকেরা অবগত আছেন যে, শিল্পের ১৭টি খাতে পুরোনো মজুরিকাঠামো পরিবর্তনের নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেছে।
এছাড়াও, আরও তিনটি খাতে নতুন মজুরিকাঠামো ঘোষণার সময় হবে জানুয়ারিতে। অর্থাৎ, বর্তমানে ২০টি খাতের শ্রমজীবীদের জন্য বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নতুন মজুরিকাঠামো প্রয়োজন। এটি কোনো নতুন দাবি নয়, বরং শ্রম আইনের নির্ধারিত সময়সীমার আলোকেই এই পরিবর্তন আবশ্যক।
এ মুহূর্তে ওই ২০ খাতের শ্রমজীবীরা পুরোনো মজুরি হারে টাকা পাচ্ছেন। যেহেতু বছরে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট হয় এবং মূল্যস্ফীতি ৮-৯ শতাংশের বেশি, সে কারণে এই শ্রমিকদের ‘প্রকৃত মজুরি’ ইতিমধ্যে অনেক কমে গেছে।
প্রতি মাসে মজুরি কমতে থাকা এই মানুষদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পুরোনো মজুরিকাঠামোর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সরকারি তরফ থেকে পর্যালোচনায় বিলম্বের কারণে অনেক খাতে অস্থিরতা চলছে।
চা-বাগানগুলোতে শ্রমিকেরা আন্দোলন করছেন। অন্যান্য খাতেও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে, যদিও সব জায়গায় শ্রমজীবীদের সংগঠিত হয়ে কথা বলার সুযোগ সীমিত।
যেসব খাতে প্রচলিত শ্রম আইনের আলোকে নতুন মজুরিকাঠামোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে, সেগুলো মূলত নিচুতলার কর্মক্ষেত্র। এই তালিকায় রাইস মিল, স মিল, বিড়িশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক এবং নিরাপত্তা সার্ভিস কর্মী ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।
ডিসেম্বর নাগাদ তৈরি পোশাক খাতের শ্রমজীবীদের মজুরিকাঠামোরও মেয়াদ শেষ হচ্ছে। উল্লেখিত ২০টি খাতের মধ্যে এমনও কর্মক্ষেত্র আছে, যেখানে মজুরি ৬-৭ বছর আগে নির্ধারিত হয়েছিল।
যেমন, অ্যালুমিনিয়াম খাতে সর্বশেষ মজুরি ঠিক হয় ২০১৮ সালে। রাইস মিলগুলোতে মজুরি নির্ধারিত হয় ২০২০ সালে। মাঝের বছরগুলোর মূল্যস্ফীতি ও ইনক্রিমেন্টের ফারাক আমলে নিলে এসব খাতে ‘প্রকৃত মজুরি’ হয়তো অর্ধেকের মতো আছে।
নতুন শ্রম আইনে বিধান (ধারা ১৩৯-চ) করা হয়েছে যে, তিন বছর পর মজুরিকাঠামো পরিবর্তন হবে, যা আগে পাঁচ বছর পর হতো। মালিকেরা বলছেন, বর্তমান মজুরিকাঠামোগুলো পুরোনো আইনের আমলে ঘোষিত হওয়ায় নতুন আইন এখনই কার্যকর হওয়ার সুযোগ নেই।
শ্রমিক সংগঠকেরা এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করছেন। তাঁদের মতে, কোনো আইন যখন সংশোধন হয়, তখন তাৎক্ষণিক সেটা কার্যকর হয়, যদি নতুন আইনে অন্য রকম কিছু বলা না থাকে।
শ্রম অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল আইনগত বিবেচনাতেই নয়, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের স্বার্থেও শ্রম খাতের পুরোনো মজুরিকাঠামোগুলো সংশোধন হওয়া দরকার। অনেক খাতের শ্রমিকদের গড় মজুরি সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন গ্রেডের বর্তমান বেতনের চেয়ে বহুগুণ কম।
অথচ এই সবাইকেই একই বাজারে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলে সবচেয়ে নিচের গ্রেডে মূল প্রারম্ভিক বেতন ২০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, একজন চা-শ্রমিকের মাসিক বেতন ৬ হাজার টাকার কম। এই বাগিচাশ্রমিকেরা এমনকি ভবিষ্যৎ মজুরির দাবিও করছেন রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের ২০তম গ্রেডের বেতনের চেয়ে বহু কম।
শ্রমজীবীরা কম দাবি করলেও বা সামাজিক বাস্তবতার কারণে কম দাবি করতে বাধ্য হলেও, একটি দেশে এ রকম কাঠামোগত ব্যবধান বিপজ্জনক। এ রকম ব্যবধান গভীর ক্ষোভ তৈরি করে।
এমন ক্ষোভের সহিংস প্রকাশ ২৬ মাস আগে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে। তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতনকাঠামোতে মাসিক নিম্নতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
যদি রাষ্ট্রীয় পে স্কেল প্রণয়নকারীরা সরকারি দপ্তরগুলোর একদম নিচু গ্রেডের কর্মচারীর শোভন জীবনযাপনের জন্য ২০ হাজার টাকা প্রারম্ভিক মূল বেতনকে ন্যূনতম মানদণ্ড ভেবে থাকেন, তাহলে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম ১২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরি একটি কাঠামোগত বঞ্চনা নির্দেশ করে।
মতামত (0)