জাতীয়সরকারি চাকরির পরীক্ষা ঢাকায় কেন্দ্রীভূত, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রার্থীদের ভোগান্তি
সরকারি চাকরির পরীক্ষা ঢাকায় কেন্দ্রীভূত, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রার্থীদের ভোগান্তি
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে স্থগিত হয়েছে। এতে প্রায় সোয়া তিন লাখ প্রার্থী ভোগান্তির শিকার হন।
গত শনিবার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রিলিমিনারি স্থগিত করা হয়। পরীক্ষার হলে বসে প্রার্থীরা জানতে পারেন যে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এবং পরীক্ষা হবে না। অনেক চাকরিপ্রার্থী তখন ওএমআর ফরম পূরণ করা শুরু করেছিলেন।
এই পরীক্ষা দিতে দেশের সব কটি জেলা থেকে প্রায় সোয়া তিন লাখ প্রার্থী ঢাকায় এসেছিলেন। তাঁরা বাস, ট্রেন ও লঞ্চসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রাজধানীতে পৌঁছান। দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া এবং থাকা-খাওয়ায় তাঁদের ভালো অঙ্কের টাকা খরচ হয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা বাংলাদেশে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। বিগত বছরগুলোতে এটি প্রাথমিক ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, মেডিক্যাল কলেজ ভর্তি এবং বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় দেখা গেছে। একপর্যায়ে এই সমস্যা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছিল।
প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি অতি মুনাফাদায়ী পেশায় পরিণত হয়েছিল। চিকিৎসা পেশা ছেড়েও অনেকে কোচিং ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্রে জড়িত হয়েছেন। রাজনৈতিক দলের ছাত্রনেতা, ব্যর্থ চাকরিপ্রার্থী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-দপ্তরের গাড়িচালক থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মিলেমিশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্র তৈরি করেছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সিআইডি পুলিশ আবেদ আলী চক্রকে গ্রেপ্তার করে। তিনি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের একজন গাড়িচালক ছিলেন এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতা ছিল। তাঁর ১২টি ব্যাংক হিসাবে ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়।
আবেদ আলীর ঢাকার উত্তরায় একটি ছয়তলা বাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট ও একটি গাড়ি ছিল। মাদারীপুরের ডাসারে গ্রামের বাড়িতে তিনি একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর ছেলে, স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনের নামেও কোটি কোটি টাকার সম্পদ পাওয়া যায়।
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রও নতুন কৌশল অবলম্বন করে। একসময় হাতের ঘড়ি এবং কানের ভেতরে ছোট ইলেকট্রিক ডিভাইসের মাধ্যমে সরাসরি উত্তর সরবরাহ করা হতো। পরবর্তীতে, বারবার ধরা পড়ার কারণে তারা কৌশল পরিবর্তন করে।
আবেদ আলী চক্র ফাঁস করা প্রশ্ন সারা রাত ধরে মুখস্থ করিয়ে প্রার্থীদের পরীক্ষার হলে পাঠাতেন। চুক্তিবদ্ধ প্রার্থীদের জন্য তারা হোটেল ও রিসোর্ট ভাড়া করত। সেখানে শর্ত থাকত যে, মুঠোফোনসহ কোনো ধরনের ডিভাইস আনা যাবে না।
বর্তমানে বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু ভর্তি পরীক্ষা খুলনা, রাজশাহীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষা বহু বছর ধরে নিজ নিজ জেলা শহরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলো কেন শুধু ঢাকাতেই অনুষ্ঠিত হবে, এমন প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইনে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র বা প্রশ্নসংবলিত তথ্য যেকোনো উপায়ে ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর অনেকেই এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে কঠোর শাস্তির কথা বলেছেন।
আইন কঠোর হলেও মূল প্রশ্ন হলো, অপরাধীদের সাজা হচ্ছে কি না। আবেদ আলী চক্র বা অন্য কোনো চক্রের সদস্যদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধ বন্ধ করা কঠিন।
যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ২৪২টি পদের বিপরীতে প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। এর অর্থ হলো, একটি চাকরির জন্য প্রায় ১ হাজার ৩১৮ জন প্রার্থীকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। বর্তমানে যেকোনো সরকারি চাকরির জন্যই এমন তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি পাবনা জেলা পরিষদ কার্যালয়ে অফিস সহকারী বা পিয়নের ১৮টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এই পদটি জাতীয় বেতন স্কেলে ২০তম গ্রেডের। এই পদগুলোতে যাঁরা আবেদন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএ এবং অন্যান্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাস করা উচ্চশিক্ষিত তরুণরা ছিলেন। নিয়োগ পাওয়া ১৭ জনই উচ্চশিক্ষিত।
গত জুনে সমাজসেবা অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণির ৩১২টি পদের জন্য ১২ লাখ ৩৪ হাজার ৪০৯ জন আবেদন করেন। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে প্রায় ৩ হাজার ৯৫৬ জন প্রার্থী লড়েছিলেন। স্থগিত হওয়া এই পরীক্ষার নতুন তারিখ আগামী শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত কয়েক দশকে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি বড় দিক। বেসরকারি খাত অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি স্থবির রয়েছে। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না।
দেশের শ্রমবাজারের কথা বিবেচনা না করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রসার ঘটায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের জন্য শোভন চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। একটি আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জন বেকার।
প্রতিবছর ২৪ থেকে ২৫ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও সরকারি খাতে সর্বোচ্চ ২-৩ শতাংশের কর্মসংস্থান হয়। সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে এবং চাকরির নিশ্চয়তাও রয়েছে। বাকি ৩৫-৪০ শতাংশ তরুণকে প্রবাসের শ্রমবাজারে জীবিকা খুঁজে নিতে হয়। বেসরকারি খাতে কত শতাংশের শোভন বেতন-ভাতা ও চাকরির নিশ্চয়তা আছে, তা একটি প্রশ্ন।
মতামত (0)