জাতীয়চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ বছরের চুক্তি
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ বছরের চুক্তি
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছর পরিচালনার জন্য দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পিপিপি ভিত্তিতে জিটুজি এই চুক্তিতে ১০০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার জন্য দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) এই চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে চুক্তি সই অনুষ্ঠান হয়। ২০১৯ সালে দুবাই সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে এই চুক্তিটি সম্পাদিত হলো।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান এসা কাজিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী চুক্তি সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরে চালু চারটি টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। এই টার্মিনাল বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ ওঠানো-নামানো করে। ২০০৭ সালে টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই টার্মিনালে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো যায়।
নির্মাণের পর এনসিটি প্রথমে আংশিক ও পরে পুরোদমে চালু হয়। দেশীয় অপারেটরদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এত দিন এটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। বর্তমানে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড টার্মিনালটি পরিচালনা করছে।
চুক্তি সইয়ের পর নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সংবাদ সম্মেলনে জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর হলেও দুই পক্ষ সম্মত হলে আলোচনার মাধ্যমে এই মেয়াদ বাড়ানো যাবে। তবে কোনো পক্ষ রাজি না হলে চুক্তি ১৫ বছরেই শেষ হবে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে প্রথম ১০ বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ এককালীন অগ্রিম ফি হিসেবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পাবে। এই অর্থের ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ পরিচালনা শুরুর আগে পরিশোধ করা হবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কনটেইনার পরিচালনা থেকে গড় আয়ের ভিত্তিতে রাজস্বের স্তরভেদে ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত ভাগ পাবে চট্টগ্রাম বন্দর। বর্তমানে প্রতি একক কনটেইনারে বন্দরের আয় ১৪০ থেকে ১৫০ মার্কিন ডলার। এই আয়ের ৬৭ শতাংশ হিসাবে বন্দর ৯৩ ডলার ৮০ সেন্ট থেকে ১০৫ ডলার পর্যন্ত পাবে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানিয়েছে, টার্মিনাল বুঝে নেওয়ার আগে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কিছু অত্যাবশ্যকীয় শর্ত পূরণ করতে হবে। টার্মিনাল পরিচালনায় স্থানীয়ভাবে একটি কোম্পানি গঠন করে কাগজপত্র বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। পরিবেশগত সমীক্ষা ও ছাড়পত্রও জমা দিতে হবে।
সূত্র আরও জানায়, টার্মিনাল হস্তান্তরের আগে বন্দর কর্তৃপক্ষ একজন স্বতন্ত্র প্রকৌশলী নিয়োগ দেবে। তিনি যন্ত্রপাতিসহ সম্পদের অবস্থা পর্যালোচনা করে বন্দরকে একটি প্রতিবেদন দেবেন। এসব প্রক্রিয়া শেষ করে ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনাল বুঝে নেবে এবং আমদানি-রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম শুরু করবে।
এদিকে, এনসিটি পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলন করে আসছেন। গতকাল ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয়ে চুক্তি সইয়ের সময় বাইরের সড়কে সিপিবি, বাসদসহ কয়েকটি বামপন্থী সংগঠন চুক্তির প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
চুক্তি সইয়ের পর চট্টগ্রামে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ বিক্ষোভ করেছে। সমাবেশে বক্তারা চুক্তি বাতিল করে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তা না হলে আগামী সোমবার বন্দরের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারের সামনে অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন তাঁরা। শ্রমিকেরা এনসিটিকে লাভজনক টার্মিনাল হিসেবে অভিহিত করে এই চুক্তির বিরোধিতা করছেন। যদিও সরকার থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব নিলে শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।
মতামত (0)