অর্থনীতিবেনাপোল বন্দরে টানা তিন বছর আমদানি-রপ্তানি কমেছে
বেনাপোল বন্দরে টানা তিন বছর আমদানি-রপ্তানি কমেছে
দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্য টানা তিন অর্থবছর ধরে কমছে। গত অর্থবছরে রপ্তানিতে বড় ধস নামে এবং আমদানিও কমে যায়, যার প্রভাব পড়েছে বন্দরের রাজস্ব আদায়ে।
দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্য টানা তিন অর্থবছর ধরে কমেছে। গত অর্থবছরে রপ্তানিতে একটি বড় ধস দেখা গেছে। একই সময়ে আমদানিও কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে বন্দরের রাজস্ব আদায়ে।
এক বছরের ব্যবধানে ভারতে রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ ৫৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে রপ্তানি মূল্য হ্রাস পেয়েছে ৬৯ শতাংশ। এটি বন্দরের সামগ্রিক বাণিজ্য চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে।
গত তিন অর্থবছরে (২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬) এ বন্দর দিয়ে মোট ৪৭ লাখ ১৭ হাজার ৩৬৩ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। এই আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ছিল ৮১ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ধারাবাহিকভাবে কমছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৭ লাখ ২১ হাজার ৪৪১ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়, যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ছিল ২৫ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ কমে ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৯৫৩ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়, তবে পণ্যের মূল্য কিছুটা বেড়ে ২৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা হয়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি আরও কমে ১৪ লাখ ২ হাজার ৯৬৯ মেট্রিক টনে নেমে আসে, যার মূল্য ছিল ২৬ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা।
সে হিসাবে গত তিন বছরের ব্যবধানে বেনাপোল দিয়ে পণ্য আমদানির পরিমাণ প্রায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
গত তিন অর্থবছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে মোট ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৯ মেট্রিক টন পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়েছে। এই পণ্যগুলোর মোট শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ছিল ২৯ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ১০৪ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানি হয়, যার আর্থিক মূল্য ছিল ১১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ১ হাজার ৩৬৬ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানি হয়, যার আর্থিক মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ১৩ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কা লাগে। এই অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ নেমে আসে মাত্র ১ লাখ ৮৮ হাজার ২০৯ মেট্রিক টনে, এবং রপ্তানি মূল্য কমে ৪ হাজার ১৩২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ ৫৩ দশমিক ১১ শতাংশ এবং রপ্তানি মূল্য ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ কমে গেছে।
বেনাপোলের একজন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মতিয়ার রহমান জানান, দেশের ব্যবসা–বাণিজ্য অনেকটা স্থবির হয়ে আছে। তিনি বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতি এবং দুই বছর ধরে ব্যবসায়ীদের আতঙ্কের মধ্যে থাকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট শুরুর কারণে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমছে।
মতিয়ার রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরে অবস্থা আরও করুণ ছিল, তবে এখন কিছুটা উত্তরণ হচ্ছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, সাফটা (দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা) সুবিধায় আমদানি বেড়ে যাওয়ায় গড় শুল্কহার কমেছে। এর ফলে আমদানি পণ্যের পরিমাণ কমার পাশাপাশি শুল্ক আদায়েও চাপ তৈরি হয়েছে। সাফটা সুবিধায় আমদানি পণ্যে শুল্কহার কম থাকে, যা ব্যবসায়ীরা এখন বেশি ব্যবহার করছেন।
গত তিন বছরের মধ্যে গত অর্থবছরের সাফটা সুবিধায় সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে। মোট পণ্য চালানের ৩৫ শতাংশ এসেছে এই সুবিধায়, যা এর আগের বছরগুলোতে যথাক্রমে ১১ ও ৭ শতাংশ ছিল। আমদানিকারকেরা দিন দিন এই সুবিধা বেশি ব্যবহার করছেন বলে কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে।
বাণিজ্যের নিম্নমুখী ধারার বিষয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমান বলেন, "আমদানি রপ্তানি কেন কমছে, সেটা ব্যাখ্যা করা কাস্টমস বিভাগের কাজ নয়।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, "এটা ব্যাংক কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীরা বলতে পারবেন।" রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার বিষয়ে কাস্টমস বিভাগ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে থাকে।
ফাইজুর রহমান আরও বলেন, "চলতি বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে পণ্য আমদানি করলেও রাজস্ব বেড়েছে।" তিনি জানান, অনেক সময় শুল্কমুক্ত পণ্য বেশি আমদানি হচ্ছে, যেমন গত বছর চাল আমদানি শুল্কমুক্ত ঘোষণা করা হয়। আমদানি পণ্যের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে থাকা তুলাও শুল্কমুক্ত পণ্য।
বর্তমানে সাফটা সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ীরা বেশি পণ্য আমদানি করছেন বলে কমিশনার জানান। তিনি বলেন, এতে শুল্ক কম এবং দিন দিন এই সুবিধা নেওয়ার হার বাড়ায় রাজস্ব আদায় কমছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে মোট ৩ হাজার ৬০০ ধরনের পণ্য আমদানি হচ্ছে। আমদানি হওয়া পণ্যের তালিকায় শিল্পের কাঁচামাল ও কৃষিপণ্যের আধিপত্য রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্পঞ্জ আয়রন ও তুলা আমদানির শীর্ষে ছিল।
বেনাপোল দিয়ে ভারতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি হলেও সম্প্রতি রপ্তানি পণ্যের তালিকায় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁচাপাট ও তৈরি পোশাকের মতো পণ্য রপ্তানির শীর্ষে ছিল। পরের অর্থবছরে এসব পণ্যের রপ্তানি কমে যায়। বিপরীতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, সুপারি, মাছ, সুতি ও ঝুটের মতো কয়েকটি পণ্য শীর্ষে উঠে আসে।
মতামত (0)