আন্তর্জাতিক

ভেনিসে বাংলাদেশি সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ এর প্রদর্শনী ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া

ভেনিসে বাংলাদেশি সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ এর প্রদর্শনী ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া
ভেনিসে বাংলাদেশি সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ এর প্রদর্শনী ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া
রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ গত রবিবার ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে, যা প্রথম বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা হিসেবে এই উৎসবে স্থান পেল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সিনেমাটির প্রশংসা ও সমালোচনা উভয়ই করেছে।

রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ গত রবিবার ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছে। এটি ভেনিসে প্রদর্শিত প্রথম কোনো বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। সিনেমাটির প্রিমিয়ারের আগে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পোস্ট করেন। ছবিতে সুনেরাহ্ বিনতে কামাল, জাইনীন করিম, আজমেরী হক বাঁধন, রুবাইয়াত হোসেন এবং রিকিতা নন্দিনী শিমু উপস্থিত ছিলেন।

সিনেমাটির প্রিমিয়ারের পর একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এর প্রশংসা করেছে। ইন্ডিওয়্যার তাদের পর্যালোচনায় ‘সৌন্দর্যের আয়নায় ভয়, সম্ভাবনার অপূর্ণ গল্প’ শিরোনামে লিখেছে যে, বিয়ের আগে বিউটি পারলারে সাজগোজ সাধারণত আনন্দ ও নতুন জীবনের প্রস্তুতির ছবি হলেও এই সিনেমা সেই ঝলমলে আয়োজনকে ধীরে ধীরে আতঙ্কের জায়গায় পরিণত করে। রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সেই অস্বস্তিকর আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

ইন্ডিওয়্যার আরও উল্লেখ করেছে, ঢাকার একটি বিলাসবহুল বিউটি পারলারকে ঘিরে ছবির গল্প গড়ে উঠেছে। চিত্রগ্রাহক লিওনর তেলেসের ক্যামেরা সেই সৌন্দর্যের ওপর স্থির হয়, যেখানে দামি কাপড়, তাজা ফুল, আলোয় সাজানো আয়না এবং লাল-গোলাপি রঙের প্রাচুর্য রয়েছে। পারলারের বাইরের ঢাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেখানে শহরের জরাজীর্ণ রাস্তা, পথবাসী, হকার ও শিশু ভিক্ষুকদের দৃশ্য সেই বিলাসী জগতের সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে।

নির্মাতা সিনেমায় যেভাবে বিউটি পারলার এবং বাইরের ঢাকার চিত্র দেখিয়ে বৈষম্য ফুটিয়ে তুলেছেন, তার প্রশংসা করা হয়েছে। রুবাইয়াতের সিনেমায় শ্রেণিবিভাজন সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এই ছবিতেও গল্পের ভেতরে ধীরে ধীরে সেই বিভাজন জায়গা করে নিয়েছে।

ইন্ডিওয়্যার সিনেমাটির সঙ্গে কোরালি ফাজার আলোচিত বডি হরর সিনেমা ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’ এর তুলনা করেছে। বিয়ের আগে জাইনিন চৌধুরীর নিখুঁত জীবনকে আরও নিখুঁত করে তোলার চাপ বাড়তে থাকে। পারলারের ম্যানেজার চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধন অভিনীত চরিত্রটি জাইনিনের শরীরের প্রতিটি তথাকথিত ত্রুটি খুঁজে বের করে।

এরপর ক্লান্তিকর সৌন্দর্যচর্চার এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হয়। কাটা মাংস, রক্তাক্ত নখ, গালে সুচ, রক্তের ইনজেকশন কিংবা ক্ষতবিক্ষত ত্বকের দৃশ্য সহ সৌন্দর্যের নামে শরীরের ওপর চালানো এক নির্মমতার ছবি তৈরি হয়। ক্রমশ দমবন্ধ হয়ে আসা পরিবেশ এবং শরীরকে নিখুঁত করে তোলার নির্মম চাপ মিলিয়ে এই ছবিতে ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’ এর মিল পাওয়া যায়।

ইন্ডিওয়্যার সিনেমাটির কিছু সমালোচনাও তুলে ধরেছে। তারা লিখেছে যে, সৌন্দর্য, শরীর, শ্রেণি, নারীর স্বাধীনতা এবং সামাজিক বৈষম্য—এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনার পরও ছবিটি শেষ পর্যন্ত সেগুলোর যথেষ্ট গভীরে যেতে পারেনি। জাইয়ের চরিত্র ও তার সংকটকে তুলনামূলক সহজ একটি সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এর ফলে গল্পের শুরুতে যে জটিল প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছিল, তার অনেকগুলোই উত্তরহীন থেকে যায়। তবে ইন্ডিওয়্যার সিনেমাটির কারিগরি দিকের প্রশংসা করেছে।

আরেক অনলাইন গণমাধ্যম স্ক্রিন র‍্যান্ট সিনেমাটির রিভিউ করেছে ‘রূপকথার বিয়ে যখন দুঃস্বপ্ন’ শিরোনামে। এই নারী-নেতৃত্বাধীন ছবিটি প্রশ্ন তোলে যে নারীরা কীভাবে অন্য নারীদের শরীরকে দেখেন, বিচার করেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন। পিতৃতন্ত্রের তৈরি ‘নিখুঁত সৌন্দর্য’র ধারণা অনেক নারী নিজের অজান্তেই আত্মস্থ করেন।

স্ক্রিন র‍্যান্ট আরও লিখেছে, নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাটি শুধু পুরুষের মাধ্যমে কাজ করে না; অনেক সময় নারীরাই সেই ব্যবস্থার বাহক হয়ে ওঠেন। ছবিটির বড় শক্তি তার ভিজ্যুয়াল। বাড়ি, গাড়ি আর বিউটি পারলারের ভেতরেই গল্পের বেশিরভাগ আবদ্ধ থাকে।

প্রোডাকশন ও কস্টিউম ডিজাইনার জানকী ভট্টাচার্য এই সীমাবদ্ধ জায়গাগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, যাতে পুরো পরিবেশটি এক ‘সোনার খাঁচা’র অনুভূতি তৈরি করে। রঙের তীব্র ব্যবহার, সমৃদ্ধ সাজসজ্জা, জমকালো জামদানি ও অলংকার মিলিয়ে এক চোখধাঁধানো পৃথিবী তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের ভেতরেই রয়েছে বন্দিত্ব।

চিত্রগ্রাহক লিওনর তেলেসের ক্যামেরা নারীদের দ্বন্দ্ব, জটিলতা, সৌন্দর্য এবং অস্বস্তিকর অনুভূতি তুলে আনে। ছবিতে সাপ, মৃত মাছ এবং রক্তে ভেজা শরীরের মতো দৃশ্যও রয়েছে।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...