জাতীয়

ভোলার গ্যাস পাইপলাইন: ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প এখন ৩০০০ কোটি ছাড়িয়ে

ভোলার গ্যাস পাইপলাইন: ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প এখন ৩০০০ কোটি ছাড়িয়ে
ভোলার গ্যাস পাইপলাইন: ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প এখন ৩০০০ কোটি ছাড়িয়ে
ভোলায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস থাকলেও মাত্র ৬০০ কোটি টাকার পাইপলাইন না হওয়ায় তা মূল ভূখণ্ডে আনা সম্ভব হয়নি। এখন সেই প্রকল্পের খরচ ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা দেশের জ্বালানি সংকট আরও বাড়িয়েছে।

ভোলা ও এর আশপাশের অঞ্চলকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সম্ভাবনাময় হাইড্রোকার্বন হাব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই অঞ্চলের গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে আনা হয়নি। এই পাইপলাইন নির্মাণ না হওয়ার পেছনে কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠীস্বার্থ কাজ করছে কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

তৎকালীন সময়ে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই পাইপলাইন নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। অথচ এই পাইপলাইন না করে প্রতি বছর এলএনজি আমদানিতে কয়েক হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেই পাইপলাইন নির্মাণ করতে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

দেশের জ্বালানি বিদ্যুতের প্রায় ৫০ ভাগ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৬ সালের পর থেকে দেশের গ্যাস খাত ধারাবাহিকভাবে আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছে। এই আমদানিনির্ভরতার কারণে বর্তমানে বাংলাদেশকে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে।

দেশের গ্যাসের মোট চাহিদার প্রায় ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ আসে দেশি উৎস থেকে। বাকি চাহিদা মেটানো হয় আমদানি করা এলএনজি দিয়ে। এই আমদানি করা এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা ও আগ্রাসনে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। এই যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধা তৈরি হয়েছে। কাতারসহ যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশ দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি আমদানি করে, সেসব দেশের জ্বালানি অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর ফলে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকেই ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। বাধ্য হয়েই বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি সংকটকে আরও গভীর করেছে।

গ্রাম ও মফস্‌সল ছাড়িয়ে লোডশেডিং আবার রাজধানীতে ফিরে এসেছে। গ্যাস সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং বাজার খরচ বেড়েছে। সিএনজি পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস মিলছে না।

খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী কারখানা থেকে শুরু করে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান—সব কারখানাতেই উৎপাদন কমেছে। সার কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় আমনসহ কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে দেশের চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

জ্বালানি সংকট গোটা অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে বাড়তে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে। দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে ভাটার টান শুরু হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ছয় লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ইউরিয়া সারের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে।

কৃষির বিভিন্ন উপকরণের সরবরাহে সমস্যা হলে ছোট কৃষকেরা খাদ্যনিরাপত্তা ও আয়, উভয় দিক থেকেই বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়তে পারেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, সারের সংকটে যদি চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হবে।

তেল–গ্যাস–খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জ্বালানিসংকটের একটি টেকসই সমাধান নিয়ে মহাপরিকল্পনা দেয়। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এই পরিকল্পনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন, নিজেদের গ্যাসসম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপুল সম্ভাবনা বাস্তবায়নই দেশের জন্য সর্বোত্তম পথ।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...