জাতীয়

নুহাশপল্লী ভ্রমণে অপ্রত্যাশিত মানবিকতার গল্প

নুহাশপল্লী ভ্রমণে অপ্রত্যাশিত মানবিকতার গল্প
নুহাশপল্লী ভ্রমণে অপ্রত্যাশিত মানবিকতার গল্প
একজন ব্যক্তির নুহাশপল্লী পরিদর্শনে গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া আন্তরিকতা ও মানবিকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি সংবাদ।

একদিন হঠাৎ করেই হুমায়ূন আহমেদের নুহাশপল্লী পরিদর্শনের ইচ্ছা জাগে এক ব্যক্তির। কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস থেকে বেরিয়ে তিনি নুহাশপল্লীর উদ্দেশে রওনা দেন। দুপুর একটার দিকে যাত্রা শুরু হয়, তখন বাইরে প্রচণ্ড রোদ ছিল।

কিছু দূর যাওয়ার পরই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয় এবং আকাশ যেন তার সমস্ত জল একসঙ্গে নামিয়ে দেয়। যাত্রাপথে কয়েকবার যানবাহন পরিবর্তন করতে হয় এবং রাস্তাজুড়ে তীব্র যানজট ছিল। বিকেল গড়িয়ে গেলেও গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

বাসে দুজন নারীর সঙ্গে কথা হয়, যাঁরা হোতাপাড়ায় নামবেন বলে জানান। নুহাশপল্লীর কথা শুনে একজন নারী মৃদু হেসে বলেন, তাঁদের বাড়ি নুহাশপল্লীর কাছেই। বাস থেকে নেমে তাঁদের সঙ্গেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হাঁটা শুরু হয়।

সেই নারীরা পথ চলতে চলতে ওই ব্যক্তির জন্য ভীষণ দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন। কখন নুহাশপল্লী ঘুরে দেখা হবে এবং কখন আবার ঢাকায় ফেরা যাবে, তা নিয়ে তাঁরা উদ্বেগ জানান। একজন নারী মমতা নিয়ে বলেন, "দেখো মা, আমাদেরও তো একটা মেয়ে আছে। আজ যদি ও এমন বিপদে পড়ত? তুমি আজ রাতটা আমাদের বাড়িতে থেকে যাও।"

সন্ধ্যার একটু আগে নুহাশপল্লীতে পৌঁছানো হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সংস্কারের কাজ চলছে এবং কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। পরিচিত একজন লেখকের মাধ্যমে মেহের আফরোজ শাওনকে ফোন করেও কোনো লাভ হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ম্যানেজারকে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর ভেতরে ঢোকার অনুমতি মেলে। অনেকক্ষণ লীলাবতী দিঘির পাড়ে একা বসে ছিলেন তিনি। চারপাশে তখনো বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

হুমায়ূন আহমেদের সমাধির সামনে গিয়ে দাঁড়ানো হয়। পরিদর্শনের আগের দিনই তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী ছিল, তাই সমাধির ওপর তখনো শুকিয়ে না যাওয়া ফুল পড়ে ছিল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একের পর এক সমাধির ওপর পড়ছিল, যা দেখে মনে হচ্ছিল, যিনি বৃষ্টিকে এত ভালোবাসতেন, তিনি যেন এখনো বৃষ্টিবিলাস করে চলেছেন।

ঠিক তখনই পানিতে ভেসে আসা একটি ছেঁড়া, ভেজা কাগজের টুকরা চোখে পড়ে। কৌতূহলবশত সেটি তুলে দেখা যায়, তাতে ‘বাবাকে, নিষাদ’ লেখা ছিল। এই এক টুকরা ভেজা কাগজও যেন অনেক গল্প বলে যাচ্ছিল।

এমন সময় সেই নারীর ফোন আসে, যিনি আসার সময় নুহাশপল্লীর রাস্তা চিনিয়ে দিয়েছিলেন এবং বাড়িও দেখিয়ে রেখেছিলেন। তিনি বারবার তাঁদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তখন চাইলে ঢাকায় ফিরে আসা যেত, কিন্তু তাঁর আন্তরিকতা ও মায়াভরা অনুরোধ উপেক্ষা করা যায়নি।

এছাড়াও, তিনি যেভাবে পথঘাটের অনিরাপদ পরিস্থিতির কথা বলছিলেন, তাতে ওই রাতেই তাঁর বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সন্ধ্যায় তাঁদের বাড়িতে গিয়ে তাঁর মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়, যার নাম বৃষ্টি। সারা দিন যে বৃষ্টি সঙ্গ দিয়েছিল, সন্ধ্যায় এসে আরেক বৃষ্টির সঙ্গে পরিচয় হয়।

বাড়িতে মা, ছেলে আর মেয়ে থাকেন। বহু বছর পর আবার একটি মাটির ঘরে ঢুকে শৈশবের দিনগুলো মনে পড়ে। নানাবাড়ির স্মৃতি ভেসে আসে এবং মাটির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কথা মনে হয়।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বৃষ্টি আপুর সঙ্গে গ্রামের পথে বের হওয়া হয়। কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে গল্প হয় এবং বোঝা যায়, গ্রামে বড় হলেও মেয়েটি কতটা আধুনিক, মুক্তমনা আর প্রগতিশীল। মানুষকে তার ঠিকানা দিয়ে বিচার করা যায় না, সেদিন আবারও এই উপলব্ধি হয়।

রাত পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে গল্পে মেতে থাকা হয়। এমন আন্তরিক, সরল আর নিঃস্বার্থ মানুষ এখনো পৃথিবীতে বেঁচে আছে, যাদের সঙ্গে রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও মুহূর্তেই আপন করে নিতে জানে।

রাতে মাটির ঘরের বারান্দায় বসে জোনাকির আলোর খেলা, ঝিঁঝি পোকার শব্দ আর ব্যাঙের ডাক শুনতে শুনতে চোখে পানি চলে আসে। মনে হয়, বইয়ে পড়া গল্পগুলোই যেন আজ জীবনে ঘটছে। যেই ব্যক্তি সকালে বাংলাদেশ ছাড়ার জন্য উদগ্রীব ছিলেন, তাঁর ভেতরেই প্রকৃতির জন্য এক আকুল হাহাকার তৈরি হয়।

পরদিন ভোরে পাশের বিল দেখতে বের হওয়া হয়। যত দূর চোখ যায়, কেবল সবুজ আর জল দেখা যায় এবং পানির ওপর শাপলা ভেসে ছিল। প্রকৃতির দিকে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করছিল। বেশিক্ষণ সেখানে থাকা হয় না। প্রকৃতির খুব কাছে গেলে মানুষ নিজের ভেতরের একাকিত্বটাকেও যেন আরও স্পষ্ট করে অনুভব করে।

ফিরে এসে বৃষ্টি আপু ওই ব্যক্তিকে পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও তাঁর স্ত্রী থাকেন।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...