জাতীয়বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিশ্রুতির পর দেশটি বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিশ্রুতির পর দেশটি বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় এবং সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
দেশের জনগণের স্বাধীন বিচার বিভাগের আকাঙ্ক্ষা বহু পুরনো। এই আকাঙ্ক্ষা স্বাধীনতারও আগে, পাকিস্তান আমলে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখা গিয়েছিল। স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা তখন একটি অন্যতম প্রধান দাবি ছিল।
১৯৭২ সালে গৃহীত বাংলাদেশের সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দৃঢ় নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। সংবিধানে সমগ্র বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগের পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়। তবে ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সময় এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হয়।
ওই সংশোধনীতে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির হাতে হস্তান্তর করা হয়। এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি নতুন বিতর্ক শুরু হয়, যা দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি নতুন করে গুরুত্ব লাভ করে। এই অভ্যুত্থান দেশের আইন ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে বহু বিস্তৃত আলোচনার জন্ম দেয়, যেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি প্রধান বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এর মধ্যে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল।
পরে উভয় সংস্কার কমিশন নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত করার বিষয়ে অভিন্ন সুপারিশ প্রদান করে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত জুলাই সনদেও এই সুপারিশগুলো স্থান পায়।
তবে, রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার কারণে বাংলাদেশ আবারও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হারানোর দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণকারী সাংবিধানিক কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নটি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতসমূহের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি-মঞ্জুরিসহ) এবং শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল।
চতুর্থ সংশোধনী সেই ব্যবস্থা বাতিল করে এসব ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নিকট হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে পঞ্চম ও পঞ্চদশ সংশোধনী অধস্তন আদালতের ওপর রাষ্ট্রপতির কর্তৃত্ব বহাল রাখে, তবে একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিধান যুক্ত করে।
বহুল আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার রায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নিয়েছিল। তবে ওই রায় সংশোধিত ১১৬ অনুচ্ছেদে আরোপিত সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আটকে ছিল। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বিচারিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন, কিন্তু ১১৬ অনুচ্ছেদের ভাষার কারণে এ ধরনের ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও আপিল বিভাগ সচেতন ছিলেন।
পরে আপিল বিভাগ নিজেই এই কাঠামোগত সমস্যাটির কথা স্বীকার করেন। ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, যত দিন অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিষয়ক ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাতে থাকবে, তত দিন প্রকৃত বিচারিক স্বাধীনতা অধরাই থেকে যাবে।
১১৬ অনুচ্ছেদ মামলার রায়ে আদালত কোনো নতুন সাংবিধানিক ধারণা প্রবর্তন করেননি। বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে বিদ্যমান একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে আদালত তাঁর সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই অঙ্গীকারের কথা আগে বহুবার স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে।
অভ্যুত্থানের পর বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে, ১১৬ অনুচ্ছেদের ধারাবাহিক সংশোধনগুলো প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনার জন্য পেশ করা হয়। ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট একটি জনস্বার্থমূলক মামলা মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বনাম বাংলাদেশ (১১৬ অনুচ্ছেদ মামলা) দায়ের করা হয়, যেখানে ওই সংশোধনগুলোর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
১১৬ অনুচ্ছেদ মামলার গুরুত্ব মাসদার হোসেন মামলার তুলনায় অনেক বেশি। মাসদার হোসেন মামলা যেখানে সংশোধিত ১১৬ অনুচ্ছেদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিল, সেখানে এই নতুন মামলা সরাসরি সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
মতামত (0)