রাজনীতি

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলের ভূমিকা

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলের ভূমিকা
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলের ভূমিকা
আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই দিনটি বাংলাদেশের দলীয় ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-নির্মাণের প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তার ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে শুধু একটি দলের অতীত বা নেতৃত্বের স্মারক হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের দলীয় ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-নির্মাণের প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্বিমেরুকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—এই দুটি প্রধান রাজনৈতিক মেরু রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।

মাঝখানে জাতীয় পার্টি ও বিভিন্ন জোট ভূমিকা পালন করলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এই দুই বড় দলের চারপাশেই আবর্তিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের দলীয় ব্যবস্থা বহুদলীয় হলেও এর কার্যকর কাঠামো অনেকাংশে দ্বিমেরুকৃত বহুদলীয় ব্যবস্থার মতো ছিল। এই ব্যবস্থার একটি ইতিবাচক দিক হলো ক্ষমতার বিকল্প তৈরি হওয়া। তবে এর নেতিবাচক দিক হলো, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অনেক সময় নীতির বদলে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হয়ে ওঠে।

দলগুলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ রাখার চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন দুর্বল ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ কারণেই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনকে বাংলাদেশের দলীয় ব্যবস্থার একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়ে দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি সংসদীয় শক্তি অর্জন করে।

জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে; বাংলাদেশের পুরোনো দ্বিদলীয় মেরুকরণ ভেঙে নতুন একটি ত্রিমাত্রিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই ত্রিমাত্রিক প্রতিযোগিতায় বিএনপি, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি এবং ২০২৪ সালের আন্দোলন থেকে উঠে আসা নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অনুপস্থিতি এই নতুন দলীয় বিন্যাসকে এখনো অসম্পূর্ণ করে রেখেছে।

ফলে বর্তমান দলীয় ব্যবস্থা কতটা স্থায়ীভাবে রূপান্তরিত হয়েছে, তা পরবর্তী পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে। বিএনপির জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থেকে যে দল গণতন্ত্র, নির্বাচন ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবি করেছে, ক্ষমতায় এসে তাকে প্রমাণ করতে হবে গণতন্ত্র তাদের কাছে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার পদ্ধতি নয়, ক্ষমতা পরিচালনারও নীতি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: সরকার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন এক জিনিস নয়।

একটি নির্বাচনে নতুন দল ক্ষমতায় আসতে পারে। কিন্তু যদি একই প্রশাসনিক সংস্কৃতি, একই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, একই দলীয়করণ এবং একই ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ অব্যাহত থাকে, তাহলে কেবল শাসকের পরিবর্তন ঘটে, রাষ্ট্রের চরিত্রের নয়। সুতরাং বিএনপির সামনে এখন প্রশ্ন—তারা কি ‘সরকার পরিবর্তন’-এর রাজনীতি থেকে ‘রাষ্ট্রের নিয়ম পরিবর্তন’-এর রাজনীতিতে যেতে পারবে? জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

জনগণের প্রত্যাশা কেবল নতুন সরকার নয়; তারা চেয়েছে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য, বিচার বিভাগ স্বাধীন, প্রশাসন পেশাদার, সংবাদমাধ্যম মুক্ত এবং বিরোধী মত নিরাপদ থাকবে। অর্থাৎ জনগণের আকাঙ্ক্ষা মূলত গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দিকে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনেরও পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। ১৯৭৮ সালের ১৯ দফা ছিল সে সময়ের বাংলাদেশে উৎপাদন, কৃষি, স্বনির্ভরতা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি রাজনৈতিক রূপরেখা।

২০২৬ সালের বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন স্বনির্ভরতার অর্থ প্রযুক্তি, জ্বালানি, খাদ্য, সরবরাহ-শৃঙ্খল, সমুদ্র অর্থনীতি, মানবসম্পদ ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সক্ষমতা। অর্থাৎ বিএনপিকে তার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার পুনরাবৃত্তি নয়, পুনর্ব্যাখ্যা করতে হবে। বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা।

প্রধান দলগুলোর রাজনৈতিক পরিচয় প্রায়ই প্রতিষ্ঠান বা নীতির চেয়ে নেতৃত্বের সঙ্গে বেশি যুক্ত। এর ফলে দলীয় আনুগত্য রাষ্ট্রীয় আনুগত্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। তাই বিএনপির গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে দলীয় গণতন্ত্র। প্রার্থী মনোনয়ন, নেতৃত্ব নির্বাচন, নীতি নির্ধারণ এবং তৃণমূলের অংশগ্রহণ কতটা প্রাতিষ্ঠানিক হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।

বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনটি নাম অবিচ্ছেদ্য—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি একটি আত্মনির্ভর, উৎপাদনমুখী ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক বাংলাদেশের ধারণা তুলে ধরেন। জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দলটি পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাংগঠনিক ভিত্তি দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি রাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন। খালেদা জিয়া একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং দীর্ঘ সময় বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকাতেও থেকেছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।

তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল আরও কঠিন। রাজনৈতিক মামলা, কারাবন্দিত্ব, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যু—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজ বিএনপির জন্য একই সঙ্গে আবেগ ও দায়িত্বের বিষয়। খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সম্ভবত এই যে, তিনি বিএনপিকে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠাকালীন দল থেকে একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংগঠনিক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

তার রাজনৈতিক সংগ্রাম বিএনপির সমর্থকদের কাছে গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে আছে। তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একজন নেতার জনপ্রিয়তা বা ত্যাগের ওপর একটি দল অনন্তকাল নির্ভর করতে পারে না। উত্তরাধিকারকে প্রতিষ্ঠান, নীতি ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপান্তর করাই প্রকৃত পরীক্ষা। ২০২৬ সালের বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আগের যেকোনো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী থেকে আলাদা।

কারণ এবার দলের প্রতিষ্ঠাতা ও দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের উত্তরাধিকার বহনকারী তারেক রহমান শুধু দলের চেয়ারম্যান নন, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও। বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব শুরু হয় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। এর কিছুদিন পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং সরকার গঠন করেন। এখানেই বিএনপির জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

বিরোধী দলের রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনীতি এক নয়। বিরোধী অবস্থানে সরকারের সমালোচনা করা অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু ক্ষমতায় থেকে অর্থনীতি পরিচালনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি মোকাবিলা, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানো, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন। ফলে তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হলো—তিনি কি পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতায় রূপ দিতে পারবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর বক্তৃতা বা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, সরকারের কার্যক্রমের মধ্যেই পাওয়া যাবে। ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হলো—দলটি এখন আর শুধু পরিবর্তনের দাবি জানানো রাজনৈতিক শক্তি নয়; পরিবর্তন বাস্তবায়নের দায়িত্বও তার হাতে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয় এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক ম্যান্ডেট তৈরি করেছে। কিন্তু নির্বাচনী বিজয় কোনো সরকারের চূড়ান্ত সাফল্য নয়। এটি সাফল্যের পরীক্ষার শুরু।

মানুষ এখন জানতে চাইবে—বাজারে স্বস্তি ফিরছে কি না; তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না; শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হচ্ছে কি না; বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে কি না। একই সঙ্গে বিএনপিকে বুঝতে হবে যে শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারের শত্রু নয়।

শেয়ার:

মতামত (0)

লোড হচ্ছে...