আজ বিশ্ব বাঁশ দিবস। প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর এই দিবসটি পালন করা হয়। বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার ও পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে এটি পালন করা হয়।
আজ বিশ্ব বাঁশ দিবস। প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর এই দিবসটি পালন করা হয়। ২০১০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে বাঁশ নিয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
বাংলায় 'বাঁশ দেওয়া' শব্দগুচ্ছের নেতিবাচক অর্থ থাকলেও এই দিবসের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। চীনা সংস্কৃতিতে বাঁশ ধৈর্য, শক্তি, ভদ্রতা এবং নৈতিকতার গভীর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি কেবল একটি উদ্ভিদ নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ।
বাঁশ কুটিরশিল্প, নির্মাণকাজ, বাদ্যযন্ত্র তৈরি এবং এমনকি খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। পথের ধারে, জলের ধারে বা ঝোপঝাড়ে দেখা এই পরিচিত উদ্ভিদটির বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। সারা বিশ্বে এর উপকারিতা সম্পর্কে মানুষকে জানানোই এই দিবসের মূল লক্ষ্য।
ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু অর্গানাইজেশন (ডব্লিউবিও) বাঁশের উপকারিতা তুলে ধরার জন্য এই দিবসটি পালন করে। ২০২৬ সালের দিবসের বার্তায় ডব্লিউবিও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বাঁশকে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্ব বাঁশ দিবসের সূচনা হয় থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম ওয়ার্ল্ড ব্যাম্বু কংগ্রেস (ডব্লিউবিসি) থেকে। ওই কংগ্রেসে থাইল্যান্ডের রয়্যাল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট সহযোগিতা করেছিল। বিশ্বের গবেষক, উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের প্রধান বৈশ্বিক সম্মেলন হলো ডব্লিউবিসি।
১৯৮৪ সালে ক্যারিবীয় সাগরের যুক্তরাষ্ট্রের স্বশাসিত অঞ্চল পুয়ের্তো রিকোতে বাঁশ কংগ্রেসের প্রথম আসর বসেছিল। জাপানের মিনামাতায় ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত ডব্লিউবিসির তৃতীয় আসরে ইন্টারন্যাশনাল ব্যাম্বু অ্যাসোসিয়েশন (আইবিএ) প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৪ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ আসরে আইবিএকে ডব্লিউবিওতে রূপান্তর করা হয়। পরের বছর ২০০৫ সালে ডব্লিউবিও আইনগতভাবে একটি সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
বিশ্ব বাঁশ দিবস জাতিসংঘ ঘোষিত কোনো আন্তর্জাতিক দিবস নয়। এটি বিশ্ব বাঁশ সংস্থার উদ্যোগে পালিত একটি বৈশ্বিক সচেতনতামূলক দিবস। বিভিন্ন দেশে বাঁশ রোপণ, কর্মশালা, প্রদর্শনী, গবেষণা ও স্থানীয় পর্যায়ের নানা আয়োজনের মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়।
বিশ্ব বাঁশ দিবসের এবারের বার্তা হলো 'ব্যাম্বু বিয়ন্ড বর্ডারস' বা 'সীমানা ছাড়িয়ে বাঁশ'। এই বার্তায় শুধু বেশি করে বাঁশ গাছ লাগানোই নয়, পরিবেশের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পায়নে বাঁশের গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। গ্রাম থেকে শহর, কৃষিজমি থেকে কারখানা, এমনকি আধুনিক স্থাপত্য পর্যন্ত বাঁশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের অবক্ষয় এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্নে বাঁশ নতুন করে আলোচনায় আসছে। বাঁশের শিকড় মাটির নিচে ঘন জালের কাঠামো তৈরি করে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত 'মেরিটস অব ব্যাম্বু ইউটিলাইজেশন ইন আর্থ প্রিজারভেশন, ওয়াটার অ্যান্ড ওয়েস্টওয়াটার ট্রিটমেন্ট' শিরোনামের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই আঁশযুক্ত জাল মাটির ক্ষয় কমাতে ও গুণমানের পতন ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে শিকড়ের এই জাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার সময় ক্ষতিকর উপাদান আটকে যেতে পারে। তবে বাঁশের প্রজাতি, পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার ধরন অনুযায়ী এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
অনেকে বেশি করে বাঁশ লাগিয়ে কার্বন সংরক্ষণের পরামর্শ দেন। তবে এ ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকার প্রয়োজন আছে। ২০২৫ সালে এনভায়রনমেন্টাল রিভিউজ সাময়িকীতে প্রকাশিত সুমন দত্ত ও তাঁর সহলেখকদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাঁশ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন গ্রহণ করে এবং তার দেহে তা জমা রাখে। কিন্তু বাঁশ কেটে পুড়িয়ে ফেললে সেই কার্বন আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে যেতে পারে।
ফলে বাঁশ জলবায়ুর জন্য কতটা উপকারী, তা শুধু কত বাঁশ লাগানো হলো তার ওপর নির্ভর করে না। বাঁশ কীভাবে উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও তদারক করা দরকার। সুমন দত্ত ও তাঁর সহলেখকেরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে বাঁশ নিয়ে আরও গবেষণা দরকার।
জাপানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কিয়োটোতে বাঁশের তৈরি কাঠামোর বৈদ্যুতিক গাড়ি 'ব্যামগু' তৈরি করা হয়েছিল ২০০৮ সালের ১৪ নভেম্বর।
মতামত (0)